দশমিনা উপজেলায় তেঁতুলিয়া নদীর বুকে জেগে ওঠা চরগুলো এখন সবুজে ভরা। উর্বর পলি মাটির এসব চরজমিতে তরমুজ চাষ করে বড় লাভের স্বপ্ন দেখছেন কৃষকরা। এ বছর ফলন ভালো হওয়ায় তাদের মুখে ফুটেছে স্বস্তির হাসি। তবে অন্যদিকে, নদীর নাব্যতা সংকট ও পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের উৎপাদন কমে গেছে। ফলে কৃষকদের স্বস্তির বিপরীতে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন নদীকেন্দ্রিক জীবিকানির্ভর জেলে পরিবারগুলো।
উপজেলা কৃষি বিভাগ জানায়, চলতি মৌসুমে প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে তেঁতুলিয়া নদীর বুকে জেগে ওঠা চরগুলোতেই প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ করছেন কৃষকরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর মাঝখানে জেগে ওঠা চরসমাদ্দার, লালচর, চরআজমাইন, চরহাদী, কালিরচর, পূর্ব কালিরচর, ভাটারচর, পাতারচর, চর ত্রিলোক্য, ভালাইশিং, পাঁচখালী, চরবারহান, চরশাহজালাল ও বলচরের বিস্তীর্ণ জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। নদীর বুকজুড়ে এসব চরে এখন রসাল তরমুজের সমাহার। অল্প সময়ের মধ্যে ভালো ফলন হওয়ায় চাষিদের মুখে হাসি ফুটেছে।
জানা যায়, গত ৫-৬ বছর ধরে শুকনা মৌসুমে এসব চরে নিয়মিত তরমুজ চাষ হয়ে আসছে। প্রতি বছরই ভালো ফলন পাচ্ছেন কৃষকরা।
ভালাইশিং ও পূর্ব কালিরচরের তরমুজ চাষি মাশারফ হাসান বলেন, “একসময় এই তেঁতুলিয়া নদীগর্ভেই আমাদের রেকর্ডভুক্ত ঘরবাড়ি ও আবাদি জমি বিলীন হয়ে গেছে। অসংখ্য মানুষ নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। ভাঙনের পরও আমরা জমির খাজনা পরিশোধ করে আসছি। আমার পাঁচ একর জমিতে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে তরমুজ চাষ করেছি। ফলন ভালো হয়েছে। ঈদের পর বাজার ভালো থাকলে প্রায় ১৫ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করতে পারব।”
এদিকে, লালচরের সরকারি খাস জমিতে বন্দোবস্তপ্রাপ্ত তরমুজ চাষি নুরুল হক, আবাস ও হাবিব বলেন, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এ বছর বাম্পার ফলন ও ভালো দামের আশা করছেন তারা।
দশমিনা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাফর আহমদ বলেন, “গত বছরের মতো এ বছরও তরমুজের ভালো ফলন দেখা যাচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কৃষকরা বাম্পার ফলনের পাশাপাশি ভালো দামও পাবেন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।”
তবে নদীর বুকে চাষাবাদ করে কৃষকদের মাঝে স্বস্তি ফিরলেও নাব্যতা সংকটের কারণে নদীনির্ভর জেলে পরিবারগুলো পড়েছে চরম বিপাকে। একসময় তারা জালভর্তি ইলিশ, পায়রা, ফাঁসা, বাটা, আইড়, পাঙ্গাশ, কাঁকড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরে ফিরতেন। কিন্তু নদীতে চর জেগে ওঠা ও ডুবোচরের কারণে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় আগের তুলনায় মাছের পরিমাণ অনেক কমে গেছে।
কাটাখালী এলাকার জেলে আল আমিন ও কুদ্দুস মাল্লা বলেন, “নদীতে একাধিক চর জেগে ওঠায় মাছের পরিমাণ অনেক কমে গেছে। আবার জাটকা রক্ষায় মার্চ-এপ্রিল দুই মাস এবং মা ইলিশ রক্ষায় অক্টোবর মাসে মাছ ধরা বন্ধ থাকে। বাকি সময়েও তেমন মাছ পাওয়া যায় না। সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়েছে।”
সৈয়দ জাফর গ্রামের জেলে আবুল বশার বলেন, “তেঁতুলিয়া নদীতে এখন অসংখ্য ডুবোচর। সারাদিন জাল ফেলেও দু-চারটি মাছ পাওয়া যায়। এতে সংসার চলে না। তাই মাছ ধরা ছেড়ে অন্য পেশায় যাওয়ার কথা ভাবছি।”
উপজেলা মৎস্য বিভাগ জানায়, দশমিনায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার। তেঁতুলিয়া নদীর নাব্যতা হ্রাস ও অস্বাভাবিক চর জেগে ওঠায় পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র কমে গেছে। নদীর গভীরতা কমে যাওয়ায় বড় মাছগুলো গভীর পানির দিকে চলে যাচ্ছে। পাশাপাশি চরাঞ্চলে কৃষিকাজে ব্যবহৃত সার ও কীটনাশকের প্রভাবেও পানি দূষিত হয়ে মাছের আবাসস্থল অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।
দশমিনা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, “ঘন ঘন চর জেগে উঠলে নদী তার স্বাভাবিক প্রবাহ হারায়। এতে মাছের উৎপাদন ও বিচরণ কমে যায়। নাব্যতা কমে যাওয়ার ফলে জেলেরা কম মাছ পাচ্ছেন, যা তাদের জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তেঁতুলিয়া নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”