
X
চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে জ্বর, চোখ লাল হওয়া, কাশি ও শরীরে লাল ফুসকুড়ি নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
চট্টগ্রামসহ দেশের অন্তত ১০টি জেলায় হাম রোগ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে জ্বর, চোখ লাল হওয়া, কাশি ও শরীরে লাল ফুসকুড়ি নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেবল নগরেই নয় গ্রামেও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে হাম সদৃশ্য এসব উপসর্গ। তাই অনেকের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ, দেখা দিয়েছে আতঙ্ক।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, নরসিংদী, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা, ভোলায় সংক্রমণ বেশি। অন্য কিছু জেলায়ও শিশুরা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসছে। এদিকে চলতি মার্চ মাসে শুধু রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেই ১৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, সময়মতো টিকা না নেওয়া, টিকার সংকট ও সরকারি বুস্টার ডোজ সময়মতো না আসায় হামের প্রকোপ বেড়েছে। তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, হামের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার সর্বোচ্চ প্রস্তুত রয়েছে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে এবং ভাইরাসজনিত উচ্চ সংক্রামক রোগ হওয়ায় হাঁচি-কাশি, কথা বলা বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। হামের জটিলতা থেকে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, চোখ-মাথায় প্রদাহে আক্রান্ত হয় শিশু। এসব শিশুকে হাসপাতালে আলাদা ব্যবস্থাপনায় রেখে চিকিৎসা দিতে হয়।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের একাধিক সূত্র জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের মধ্যে ভাইরাস জ্বর ও নিউমোনিয়ার পাশাপাশি হাম-সদৃশ উপসর্গও দেখা যাচ্ছে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব ঘোষণা করা হয়নি। তবে টিকাদানে অনীহা ও সচেতনতার ঘাটতিকে সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এর শিশু বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত কয়েক সপ্তাহে জ্বর ও ফুসকুড়ি নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুর সংখ্যা প্রায় অর্ধশতাধিক।
চিকিৎসকরা জানান, ‘অনেক শিশুই হাম বা হাম-সদৃশ লক্ষণ নিয়ে আসছে। তবে ল্যাব কনফার্ম ছাড়া নিশ্চিত করে বলা যাবে না হাম হয়েছে কি না। যদিও অভিভাবকরা এ নিয়ে বেশ আতঙ্কিত। আমরা তাদের শান্ত রাখার এবং সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছি।’
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘টিকাদান কর্মসূচি নিয়মিত চললেও অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে শিশুরা সময়মতো টিকা পাচ্ছে না। এতে করে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে।’
রাউজান উপজেলার বাসিন্দা নিলুফার জাহান বলেন, ঈদের তিনদিন আগে আমার তিন বছরের বাচ্চার শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিয়েছিল। তার জ্বরের পাশাপাশি নিউমোনিয়াও দেখা দেয়। তখন হামের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। ডাক্তার ঔষুধ দিয়েছে নেবুলাইজার করা হয়েছে একাধিকবার। এখন কিছুটা সুস্থ হলেও হামের আতঙ্ক পিছু ছাড়ছে না।
চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের কারো কারো সন্তান সম্প্রতি জ্বর ও ফুসকুড়িতে আক্রান্ত হয়েছে। কেউ কেউ প্রাথমিকভাবে এটিকে সাধারণ ভাইরাস জ্বর ভেবে অবহেলা করলেও পরে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছেন। পরে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে জেনে তারাও তাদের সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কে আছেন বলেও জানান।
দাতা সংস্থাগুলোর একটি সূত্র বলছে, এ বছরের ৪ জানুয়ারি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম হাম শনাক্ত হয়। ১০ জানুয়ারি ক্যাম্প এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়। একই সময় রাজধানীর বস্তি এলাকায় হামের রোগী বৃদ্ধি পেতে থাকে। বাংলাদেশ হামমুক্ত দেশ নয়। তবে টিকা কর্মসূচির কারণে হামের প্রকোপ কমে এসেছিল। জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, শিশুরা নিয়মিত টিকা পাচ্ছে না। দেশে বেশ কয়েক বছর হাম ও রুবেলা টিকার ক্যাম্পেইনও হয় না।
স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান নিশ্চিত করা। পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে চট্টগ্রামে হাম সংক্রমণ আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করতে পারে। তাই সচেতনতা বৃদ্ধি ও টিকাদান জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বিশেষজ্ঞরা।