
X
বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় কৃষকরা চাষ করে আসছেন ধান, গম, মসুর, রসুন, পিয়াজ ও মৌসুমী বাহারী সব সবজি। দীর্ঘদিনের এবার সেই শৃঙ্খলা ভেঙ্গে এবার মাঠে এক কানি জমিতে শখের বসে করেছেন স্ট্রবেরি চাষ। এতেই বাজিমাত স্থানীয় কৃষক মো. রকিবুল ইসলামের (৩৫)।
সবুজ পাতার ফাঁকে লাল টুকটুকে স্টবেরির জমির চারপাশে দেয়া হয়েছে জালের বেড়া, বাদ পরেনি গাছের উপরের অংশও সেখানেও পাখিদের জন্য টানানো হয়েছে জাল। জালের ভেতরে সারি সারি লাইনে রয়েছে সবুজ গাছ আর সেই সবুজের ভাঁজে ভাঁজে উঁকি দিচ্ছে টকটকে লাল স্ট্রবেরি। যা এক সময় শখের বশে করত সেই ফসল এখন স্থোনীয় কৃষকদের ভাগ্যবদলের প্রধান ফসল হয়ে উঠেছে।
ঈশ্বরদী উপজেলার ভাড়ইমারী, জগন্নাথপুর, মানিকনগর পূর্বপাড়া ও মানিকনগর পশ্চিমপাড়াসহ কয়েকটি এলাকার মাঠে আবাদ করা এই স্ট্রবেরি চাষে রীতিমতো বিপ্লব ঘটে গেছে। উচ্চমূল্যের এই ফসলে স্বল্প সময়ে মিলছে অধিক লাভ। ফলে অন্যান্য ফসলের তুলনায় স্ট্রবেরি চাষেই বেশি ঝুঁকছেন স্থানীয় চাষিরা।
তবে বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও পচনশীল এই ফল দ্রুত বাজারজাত ও আধুনিক সংরক্ষণের অভাব বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি তদারকি আর হিমাগার সুবিধা পেলে ঈশ্বরদীর এই স্ট্রবেরি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশের বাজারেও রপ্তানি করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, দীর্ঘ সময় হিমায়িত রাখলে স্ট্রবেরির উজ্জ্বল লাল রং ফ্যাকাসে হয়ে যায় এবং এর প্রাকৃতিক সুগন্ধ ও মিষ্টি স্বাদ কমে যেতে পারে। ফলে হিমাগার সুবিধা থাকলেও কেউ এই ফল রাখেন না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মাথায় গামছা পেচিয়ে কৃষকরাকাজে ব্যস্ত সময পার করছেন স্টবেরী ক্ষেতে। জমির আগাছা বাছাই, সার দেওয়া, ওষুধ ও কিটনাশক ছিটানোসহ স্ট্রবেরির পরিচর্যায় করতে দিন রাত্রি এক করে ফেলছেন চাষিরা। অনেকেই পরিচর্যার ফাঁকে গাছ থেকে সংগ্রহ করছে পাকা স্ট্রবেরি। যা স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি করা হচ্ছে। আকারে বড়, সুস্বাদু আর সুগন্ধযুক্ত হওয়ায় এঅঞ্চলের স্ট্রবেরির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে দেশ জুঁড়ে।
স্থানীয় চাষিরাদের ভাষ্যমতে, প্রতি বিঘা স্ট্রবেরী চাষের জন্য চারা গাছ প্রয়োজন হয় প্রায় ৫ হাজারের মত। প্রতিপিচ রোপন যোগ্য স্ট্রবেরির চারার মূল্য পরে ২৫ থেকে ৩০ টাকা। যা ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত রোপন করতে হয়। চারা, কীটনাশক, সেচসহ প্রতিবিঘা স্ট্রবেরী চাষে খরচ হয় দুই লক্ষ পঁঞ্চাশ হাজার টাকার মত। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে টানা ২-৩ মাস ভরপুর ফল সংগ্রহ করা যায়। ফলন আর বাজার ঠিক থাকলে প্রতি বিঘায় প্রায় দশ লক্ষ টাকার স্ট্রবেরী বিক্রি হয়।
উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ মৌসুমে উপজেলায় ১ হেক্টর জমিতে স্ট্রবেরির চাষ হয়েছে। আর উৎপাদন হয়েছে ১৮ মেট্রিক টন। এবার ২০২৬-২৭ মৌসুমে এই ফসল চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ হেক্টর এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৫ মেট্রিক টন।
চাষি রকিবুল ইসলাম বলেন, স্ট্রবেরি চারা ভাদ্রের মাঝামাঝি থেকে আশ্বিন মাসে লাগাতে হয়। আমি গত কয়েক বছর ধরে স্ট্রবেরীর চাষ করছি। এ বছরও দুই বিঘা জমিতে চাষ করেছি। বিঘায় আড়াই লক্ষ টাকার মতো খরচ হলেও বিক্রি করা যায় প্রায় দশ লাখ টাকার ফল।
চাষি আব্দুল কাদের বলেন, স্ট্রবেরি চাষ লাভজনক। তবে যদি বৃষ্টি হয় বা আবহাওয়া ঠিক না থাকে তবে এটি চাষ করা কঠিন। বৃষ্টির পানি হলে এতে পচন ধরে। ভালো ফল পাওয়া যায় না। তখন দূরের ব্যবসায়ীরা স্ট্রবেরি কিনতে আসেন না।
ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম বলেন, আমি রাজশাহী থেকে এসে এখানে স্ট্রবেরি ক্রয় করি। ঈশ্বরদীর স্ট্রবেরির মান খুবই ভালো। এবার ফলের সরবরাহ তূলনা মূলক বেশি। বাজারে দামও তুলনামূলক ভাবে একটু কম।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল মমিন বলেন, স্ট্রবেরি চাষের জন্য এবারের আবহাওয়া ছিলো অনুকূলে। কৃষকরা ভালো ফলন ও মূল্য পাওয়ার তাদের আগ্রহ বাড়ছে। স্ট্রবেরী চাষে আমরা পরামর্শ দিয়ে এর চাষ বৃদ্ধির চেষ্টা করছি। আশা করা যাচ্ছে আগামী বছর স্ট্রবেরি চাষ বৃদ্ধি পাবে।