
X
বান্দরবানের থানচিতে শুরু হয়েছে বৈসাবি উৎসব
বান্দরবানের দুর্গম থানচি উপজেলায় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ উৎসব বৈসাবির আনন্দধারা বইতে শুরু করেছে। মারমাদের সাংগ্রাই, ত্রিপুরাদের বিষু এবং চাকমাদের ফুল বিজুকে কেন্দ্র করে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে পাহাড়ি জনপদ। দেশের অন্যত্র পহেলা বৈশাখ একদিনে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখানে টানা আট দিনের আয়োজনে উৎসব ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম থেকে গ্রামে, পাড়া থেকে পাড়ায়।
রবিবার (১২ এপ্রিল) ভোরে সূর্য ওঠার আগেই বলিপাড়া বাজার সংলগ্ন শঙ্খ নদী তীর ও আশপাশের খাল–ছড়ায় ফুল হাতে জড়ো হন চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ। গঙ্গাদেবীর উদ্দেশ্যে বাহারি রঙের ফুল ভাসিয়ে প্রার্থনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় ‘ফুল বিজু’ বৈসাবির আনুষ্ঠানিক প্রথম পর্ব। আগের সকাল থেকেই ছিল বর্ণাঢ্য গণশোভাযাত্রা।
উৎসবের ধারাবাহিকতায় সোমবার মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাই শোভাযাত্রা এবং মঙ্গলবার ত্রিপুরা ও ম্রো সম্প্রদায়ের বিষু আয়োজনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী জলখেলাও রয়েছে কর্মসূচিতে।
এবার উপজেলার বলীপাড়া ইউনিযনের ভরত পাড়া, রায়মোহন পাড়া, কমলাবাগান পাড়া, জ্ঞানলাল পাড়া ও ব্রহ্মদত্ত পাড়া-এই পাঁচ গ্রামে তরুণ-তরুণীদের উদ্যোগে সমন্বিতভাবে দিনটি উদযাপন করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি সংগঠিত ও বিস্তৃত।
চাকমা লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, পুরোনো বছরের দুঃখ-গ্লানি ও পাপাচার থেকে মুক্তির আশায় গঙ্গা দেবতার উদ্দেশ্যে ফুল ভাসিয়ে পুরাতন বছরকে বিদায় জানানো হয়। এতে নতুন বছর বয়ে আনে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির বার্তা। তাই ভোর থেকে নদী-খালে প্রার্থনায় অংশ নেন সব বয়সী নারী-পুরুষ। বর্তমানে এই ফুল বিজু আর কেবল চাকমাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; মারমা, ত্রিপুরা ও স্থানীয় বাঙালিরাও অংশ নিচ্ছেন।
ফুল ভাসানোর পর তরুণরা নদীতে স্নান করে বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রণাম করেন। ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে অতিথি আপ্যায়নের প্রস্তুতি চলে। গ্রামীণ খেলাধুলা, আড্ডা আর হাসি-আনন্দে মুখর হয়ে ওঠে পাড়াগুলো। এ বছর নিজ নিজ গ্রামের পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক সমন্বিত আয়োজন উৎসবকে দিয়েছে নতুন মাত্রা।
চাকমা যুবনেতা রনিজ চাকমা ও কিরণ জ্যোতি চাকমা জানান, “গত বছর গ্রামভিত্তিক আয়োজন ছিল, এবার আমরা বড় পরিসরে একসাথে করছি। আগামী বছর উপজেলা জুড়ে আরও বৃহৎ পরিসরে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।”
নিরাপত্তা প্রসঙ্গে থানচি থানা-এর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি কানন সরকার বলেন, “পাহাড়ে বিভিন্ন ভাষাভাষী সম্প্রদায় পৃথকভাবে সাংগ্রাই, বিজু ও বিষু উদযাপন করছে। আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় পুলিশ সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে। সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি আমাদের হাতে আছে।”
বৈসাবির এই রঙিন সূচনায় পাহাড় যেন জানিয়ে দিল-ঐতিহ্য, সম্প্রীতি আর আনন্দই এখানে নতুন বছরের প্রথম বার্তা।