
বাংলা নববর্ষ মানেই একসময় গ্রামবাংলার হাট-বাজারে উৎসবের আমেজ, আর সেই আমেজের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ঐতিহ্যবাহী ‘হালখাতা’। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে ডিজিটাল লেনদেনের ভীড়ে ময়মনসিংহের ভালুকায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে নববর্ষের সেই চিরচেনা গ্রামীণ হালখাতার রীতি।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, আগের মতো আর তেমন জাঁকজমক করে হালখাতার আয়োজন করছেন না ব্যবসায়ীরা। কোথাও কোথাও নামমাত্র আয়োজন থাকলেও অনেক দোকানেই এ প্রথা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। আগে যেখানে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে দোকানে দোকানে নতুন খাতা খুলে পুরনো দেনা-পাওনা মিটিয়ে মিষ্টিমুখ করানো হতো, এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই বিরল।
উপজেলার এক প্রবীণ ব্যবসায়ী বলেন, “আগে হালখাতা ছিল আমাদের জন্য বড় উৎসব। ক্রেতাদের নিমন্ত্রণ করে এনে আপ্যায়ন করা হতো। কিন্তু এখন মানুষ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন করছে, দোকানে আসার প্রয়োজন কমে গেছে।”
অন্যদিকে তরুণ ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার কারণে হালখাতার প্রয়োজনীয়তা কমে গেছে। এতে সময় ও খরচ দুটোই বাঁচছে। ফলে তারা ঐতিহ্যগত আয়োজনের দিকে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
স্থানীয় ক্রেতারাও বলছেন, ব্যস্ততা ও আধুনিক জীবনযাত্রার কারণে আগের মতো হালখাতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ বা আগ্রহ দুটোই কমে গেছে। অনেকেই এখন ঘরে বসেই দেনা-পাওনা পরিশোধ করছেন, ফলে বাজারে গিয়ে সামাজিক যোগাযোগের যে পরিবেশ তৈরি হতো, তা আর হচ্ছে না।
এদিকে সাংস্কৃতিক সচেতন মহল বলছে, হালখাতা শুধু ব্যবসায়িক হিসাবের বিষয় নয়, এটি ছিল গ্রামীণ সমাজে সৌহার্দ্য ও সম্পর্ক জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ঐতিহ্য হারিয়ে গেলে গ্রামীণ সংস্কৃতির একটি মূল্যবান অধ্যায় বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ডিজিটাল যুগের সুবিধার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি এলেও, ভালুকার গ্রামীণ হালখাতার মতো ঐতিহ্যবাহী আয়োজন হারিয়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে এক ধরনের আক্ষেপ রয়ে গেছে। নতুন প্রজন্মের মাঝে এ সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ—নয়তো একদিন এটি কেবল স্মৃতির অংশ হয়ে ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাবে।