
X
শেবাচিমের শিশু ওয়ার্ড
বরিশাল শের-ই-বাংলা হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডের ৭০ বেডে চলছে ৫’শ রোগীর চিকিৎসা। মাত্র ৭০ বেডের জনবল নিয়ে পাঁচশত ভর্তি থাকা শিশুদের প্রয়োজনীয় কোন চিকিৎসাই দিতে পারছেনা ডাক্তার ও নার্স। আর এর সর্বচ্চ ভয়াবহতা দেখা দিয়েছে হামের প্রকোপ বাড়ার সাথে সাথে। বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে এক বেডে তিন শিশুকে রেখে চলছে চিকিৎসা।
শিশুদের কান্না, মায়েদের উৎকণ্ঠা আর ভ্যাপসা গরমে নাজেহাল অবস্থা সেখানে। নামমাত্র আইসোলেশন, একই শয্যায় গাদাগাদি করে শুয়ে তিনজনই আক্রান্ত। পাশে তিনজন মা। সব মিলিয়ে ছয়জনের ঠাঁই একটি শয্যায়। অথচ একটি শিশু হাসপাতালের নির্মান কাজ শুরু হয়েছিলো দীর্ঘ কয়েক বছর আগে। জনবল নিয়োগের অভাবে অদ্যবধি সেটা চালু হয়নি। শিশু হাসপাতালের অভাবে অকালে মৃত্যুর কোলে ঝড়ছে হামসহ নানা রোগে আক্রান্ত শিশুরা। ফলে বরিশাল অঞ্চলে ভেংগে পড়েছে শিশু চিকিৎসা সেবা।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ১৫টি শয্যার বিপরীতে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে অর্ধশতাধীক হাম আক্রান্ত শিশু। প্রতিদিন নতুন করে ভর্তি হচ্ছে ৮ থেকে ১০ জন শিশু। জায়গা না পেয়ে অনেক শিশুকে মেঝেতে শুইয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঠাণ্ডা-জ্বর, ফুসকুড়ি নিয়ে আসা শিশুদের ভিড়ে উপচে পড়ছে ওয়ার্ড। কোথাও কোনো নির্দিষ্ট দূরত্ব নেই, নেই আলাদা করে সংক্রমণ রোধের ব্যবস্থা। যে আইসোলেশন থাকার কথা, বাস্তবে তা কেবল একটি শব্দমাত্র। চিত্রটি আরো উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যখন জানা যায়, হাসপাতালের দ্বোতলা ও তিনতলায় সাড়ে ৪’শ শিশু রোগী ভর্তি। এর মধ্যে প্রায় ১’শই নবজাতক। অথচ এখানে নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ সুবিধা। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, বরিশাল বিভাগে ইতোমধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
হাসপাতালের শিশু বিভাগের রেজিস্টার ডা. বেলফার হোসেন জানান, হামের প্রকোপের চেয়েও এখন আতংক বিরাজ করছে বেশি। অন্য রোগ হলেও হাম হয়েছে ধারনা করে অভিভাবকরা শিশুদের নিয়ে এই হাসপতালে আসছে। এতেই ধারন ক্ষমতার চেয়ে বহুগুন বাড়িয়ে দিয়েছে শিশু ভর্তির সংখ্যা।
তিনি জানান, শের-ই-বাংলা হাসপতালের শিশু ওয়ার্ডে নিজস্ব ও একটি বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় ৭০ টি বেড রয়েছে। অথচ প্রতিদিন গড়ে ভর্তি থাকছে প্রায় পাঁচশত শিশু। এর বিপরীতে সহযোগী ও সহকারী অধ্যাপক রয়েছেন ৮ জন। রেজিস্টার ও সহকারী রেজিষ্টার রয়েছেন ১২ জন। মুলত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে পর্যাপ্ত বেডের পাশাপাশি দরকার তিনগুন ডাক্তার। নার্স দরকার কমপক্ষে ৩০ জন। এছাড়া এতো সংখ্যক রোগী ও স্বজনদের জন্য বাথরুম রয়েছে মাত্র ১০ টি। পুরো ওয়ার্ডে ২৪ ঘন্টার জন্য ক্লিনার ও ওয়ার্ডবয় রয়েছে মাত্র ৫ জন। এই জনবল আর সীমাবদ্ধতা নিয়ে কখনই প্রয়োজনীয় সেবা দেয়া সম্ভব নয় বলে এই চিকৎসক মনে করেন।
হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মজিবুর রহমান পরিস্থিতির সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে বলেন, শিশু ওয়ার্ডে যেমন বেডও নেই তেমনি জায়গাও নেই। আইসোলেশন করতে গেলেও অবকাঠামো দরকার। আইসিইউ দরকার। আমরা বক্স অক্সিজেন দিয়ে কোনোভাবে সামাল দিচ্ছি। কিন্তু রোগীর চাপ এত বেশি যে কাউকে ফিরিয়ে দেওয়াও সম্ভব নয়। সবাইকে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে স্বীকার করেন তিনি। তিনি আরও বলেন এক বেডে তিনজন রাখা কোনো আইসোলেশন নয়। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের দাবি, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও অধিকাংশ অভিভাবক সরাসরি শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলে আসছেন। ফলে একটি জায়গায় চাপ বাড়ছে অস্বাভাবিক। অন্যদিকে বরিশাল নগরীর আমানতগঞ্জে নির্মানাধীন শিশু হাসপাতালটি জনবল নিয়োগ দিয়ে চালু করলেও শের-ই-বাংলা হাসপাতালের উপর চাপ কমতো।
হাসপাতালের ভেতরের এই ভিড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে টিকাকেন্দ্রের ভিড়ও। কোথাও কোথাও বলা হচ্ছে টিকা নেই, আবার কিছুক্ষণ পরই মিলছে টিকা- এমন বিভ্রান্তির মুখে পড়ছেন অভিভাবকরা। গরমে শিশুদের নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে তাদের। সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত দ্বৈত সংকটের মুখে বরিশাল। একদিকে বাড়তে থাকা সংক্রমণ, অন্যদিকে সেই সংক্রমণ ঠেকানোর ব্যবস্থায় ভঙ্গুরতা। বরিশাল সদর হাসপাতালের ভিড়ে দাঁড়িয়ে এক মা বলেন, চিকিৎসার জন্য এসেছি, কিন্তু এখানে এসে ভয়টাই আরো বড় হয়ে গেছে। এই ভয়ই এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শ্যামল কুমার মণ্ডল বলেন, আমরা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আইসোলেশনের ব্যবস্থা নিতে বলেছি। কিন্তু সম্পদের সীমাবদ্ধতা বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
শিশু ওয়ার্ডে ৬০ টি আইসোলেশন রয়েছে দাবী করে শের-ই-বাংলা হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগিডিয়ার জেনারেল ডা. মমিউল মুনীর বলেন, জায়গা সংকোটের কারনে শিশু ওয়ার্ড বর্ধিত করা সম্ভব নয়। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছারও অভাব রয়েছে। তবে জনবলসহ বরিশাল শিশু হাসপাতালটি চালু হলে এ সংকোট দুর হতো বলে মনে করেন তিনি।