
X
ফল্ট লাইনগুলো বড় ধরনের ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে
বছরের প্রথম চার মাসেই বাংলাদেশ ও আশেপাশের অঞ্চলে প্রায় একশ ভূমিকম্প হয়েছে। দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সর্বোচ্চ সাত মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টির সক্ষমতা থাকা ফল্ট লাইনগুলো বড় ধরনের ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে। অথচ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই।
এ অবস্থায় প্রকৌশলীদের এক সেমিনারে ভূমিকম্প সহনীয় ভবন নির্মাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে রাজউকের একক নির্ভরতার বাইরে গিয়ে ভবন নির্মাণ তদারকিতে তৃতীয় পক্ষ যুক্ত করার কথাও উঠে এসেছে।
আজ শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) ‘ভূমিকম্প: পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারটির আয়োজক ‘প্রগতিশীল প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি সমাজ’।
গেল ২১ নভেম্বর সকালে কয়েক দশকের মধ্যে দেশের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমিকম্প হয়েছে। রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ওই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার পাশে নরসিংদীর মাধবদীতে। সে ভূমিকম্পে ১০ জন প্রাণ হারায়। আহত হয় ছয় শতাধিক মানুষ।
সেমিনারের সভাপতি প্রকৌশলী মোশাররফ হোসেন বলেন, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই বাংলাদেশ ও আশেপাশের অঞ্চলে প্রায় শতাধিক ভূমিকম্প রেকর্ড হয়েছে, যার মধ্যে ১৫-২০টি সাধারণ মানুষ অনুভব করতে পেরেছে। যা দেশের ভূমিকম্প ঝুঁকির একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।
বাংলাদেশে সিসমোগ্রাফ দিয়ে ভূ-কম্পন জরিপের ক্ষেত্রে অনেক বেশি দুর্বলতা থাকার কথা তুলে ধরে এই প্রকৌশলী বলেন, যে কারণে ‘ইউএসজিএস’ এর প্রাপ্ত তথ্যকেও ভিত্তি হিসেবে আলোচনা করতে দেখা যায়। আমাদের জানামতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূতত্ত্ব বিভাগে ১৩টি সিসমোগ্রাফ যন্ত্র দিয়ে ২০০৩ সালে একটি প্রজেক্টে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করলেও অর্থ বরাদ্দের অভাবে সেগুলো আর ব্যবহার করা হচ্ছে না।
ভূ-প্রকৃতি সম্পর্কিত তথ্যাদি সংগ্রহ করা হয় বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরকে দিয়ে, যেখানে পেশাজীবী ও গবেষকদের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ প্রকৌশলী মোশাররফ হোসেনের। ভূমিকম্পের সময়ে মানুষের নিরাপদ অবস্থান কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কাজের গুরুত্বের দিকও তুলে ধরেন এই প্রকৌশলী।
উদ্ধার তৎপরতায় নাগরিকদের যুক্ত করতে হলে ক্রেন, বুলডোজার, হ্যামার, ড্রিলসহ পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা, জনবল তৈরি, দুর্যোগকালীন সম্ভাব্য কার্যক্রমের অনুশীলন, ইত্যাদির ব্যবস্থা করার বিষয়েও জোর দেন তিনি।
বুয়েটের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারির মতে, ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সবচেয়ে জরুরি তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে ভবনের নকশা, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-রাজউককে দিয়ে নিরীক্ষণ করার মাধ্যমে নিরাপদ ভবন তৈরি করা। তাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তদারকির ব্যবস্থা থাকা উচিত।
তিনি বলেন, ভবন নির্মাণে রাজনৈতিক পর্যায়ে সঠিক দিকনির্দেশনা জরুরি। ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রমে বেশি ব্যয় হলেও প্রতিরোধমূলক নির্মাণে যথাযথ বিনিয়োগ দেখা যায় না। ভূমিকম্প সহনীয় ভবন নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে ভবনের ভেতরে নিরাপদ অবস্থান সম্পর্কে সচেতনতা এবং প্রকৌশলী ও স্থপতিদের প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ভূমিকম্প নিয়ে ঝুঁকি যাই থাকুক, প্রয়োজন সতর্কতা ও করণীয় নিয়ে মানুষকে সচেতন করা। শুধু আইন করে ঝুঁকি এড়ানোর বদলে জনগণকে সচেতন হতে হবে, যাতে অনিরাপদ ভবন তৈরি না হয়।
চিলিতে ৮ এর বেশি মাত্রার ভূমিকম্পে ৭০০ জনের প্রাণহানির সঙ্গে হাইতিতে ৭ মাত্রায় দুই লাখ মানুষের প্রাণহানির তুলনা করে বিজ্ঞানসম্মত ধারণা নিয়ে নিরাপদ ভবন নির্মাণকেই সমাধান হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।