নোয়াখালীতে প্রকাশ্যে ছেলের মারধরের অপমানে বাবার মৃত্যু। এ ঘটনার পর ওই ছেলের নির্যাতন সইতে না পেরে বাড়িছাড়া হয়েছেন বৃদ্ধা মা। এখানেই শেষ নয়, জালিয়াতির মাধ্যমে মায়ের স্বাক্ষর জাল করে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ওই ঋণ পরিশোধ না করে মাকে জেল খাটানো এবং মা ও ভাইদের মামলা দিয়ে হয়রানির ঘটনাও ঘটেছে।
ঘটনাটি ঘটেছে নোয়াখালী সদর উপজেলার পূর্ব এওজবালিয়া গ্রামের আদর্শ সমাজে আবুল খায়ের ব্যাপারি বাড়িতে। ভুক্তভোগী বিবি খোদেজা (৬৫) ওই বাড়ির প্রয়াত আবুল খায়েরের স্ত্রী। অভিযুক্ত জাকির হোসেন (৪২) তাদের তৃতীয় সন্তান। জাকির হোসেন নোয়াখালী জেলা জজ আদালতে এক আইনজীবীর সহকারী হিসেবে কাজ করছেন। তার এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে থানায় এবং জেলা আইনজীবী সমিতিসহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি ওই নারী।
জানাগেছে, পূর্ব এওজবালিয়া গ্রামের আদর্শ সমাজের প্রয়াত আবুল খায়েরের পাঁচ ছেলে, এক মেয়ে। তৃতীয় ছেলে জাকির হোসেন জেলা জজ আদালতে এক আইনজীবীর সহকারী হিসেবে কাজ করেন। ওই দাপটে নানা কূটকৌশলে নিজের বাবা-মা ও ভাই বোনদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছেন তিনি।
২০০৭ সালে মাকে জামিনদার করে ব্র্যাক ব্যাংক থেকে ৪ লাখ টাকা ঋণ নেন জাকির। পরবর্তীতে কোনো এক সময় জালিয়াতির মাধ্যমে আবারও মাকে জামিনদার সাজিয়ে একই ব্যাংক থেকে ৬ লাখ টাকা ঋণ নেন জাকির। ওই টাকা পরিশোধ না করায় ২০২২ সালের ৮ জুন বিবি খোদেজাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় পুলিশ। দেড় মাস কারাবাসের পর স্বামীর জমি বিক্রি করে ঋণ পরিশোধের পর ওই মামলা থেকে মুক্তি পান বিবি খোদেজা।
এসব বিষয়ে জিজ্ঞাসা করায় জাকির তার বাবা আবুল খায়েরকে একাধিকবার প্রকাশ্যে পিটিয়ে আহত করেন। নিরুপায় হয়ে ২০২২ সালের ১০ এপ্রিল ছেলের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দেন আবুল খায়ের। কিন্তু এতে কোনো প্রতিকার মেলেনি। উল্টো ছেলে কর্তৃক শারীরিক নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে লজ্জায় অপমানে ২০২৩ সালের ২৭ জুলাই স্ট্রোক করে মারা যান তিনি।
এরপর আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন জাকির হোসেন। মাকে নানাভাবে নির্যাতন এবং মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে ভাই-বোনদের হয়রানি শুরু করেন তিনি। ছেলের এমন অমানুষিক নির্যাতন সইতে না পেয়ে স্বামীর ভিটেবাড়ি ছাড়েন বিবি খোদেজা। গত বছর ৭ মার্চ থেকে ছোট ছেলে ইকবাল হোসেনের সঙ্গে সোনাপুর এলাকায় ভাড়া বাসায় উঠেছেন তিনি। সেখানেও শান্তিতে থাকতে দিচ্ছেন না জাকির। বাড়িতে না যাওয়ার জন্য নানাভাবে হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন।
এব্যাপারে বৃহস্পতিবার বিকেলে জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে সুধারাম মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন বলে জানান ভুক্তভোগী বিবি খোদেজা। এর আগেও ছেলের বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি এবং জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন তিনি।
বিবি খোদেজা বলেন, ‘এমন ছেলে যেন আর কোনো মায়ের পেট থেকে জন্ম না নেয়। ছেলের অপমান সহ্য করতে না পেরে তার জন্মদাতা পিতা অকালে মারা গেছেন। আর আমি মা হয়ে এ বয়সে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছি। কারো কাছে বিচার পাচ্ছি না।’
সরেজমিনে এলাকায় গিয়ে জানাযায়, অভিযুক্ত জাকির হোসেন পেশায় একজন আইনজীবীর সহকারী হওয়ায় আইনের ফাঁকফোকর আর কূটবুদ্ধি দিয়ে তার পুরো পরিবারকে জিম্মি করে রেখেছেন। বাবাকে শারীরিক নির্যাতনের ঘটনায় স্থানীয়ভাবে সালিশ বৈঠকে তাকে শাস্তিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এরপরও তিনি নিজেকে সংশোধন না করে উল্টো আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।
জাকিরের ছোট ভাই ইকবাল হোসেন বলেন, ‘আমার ভাই জাকির হোসেন পেশায় মুহুরি (আইনজীবী সহকারী) হলেও ভাবখানা ম্যাজিট্টেটের মতো। তিনি প্রকাশ্যে বাবার গায়ে হাত তোলেন। এ ঘটনার পর লজ্জায় অপমানে বাবা বাড়ি থেকে বের হতেন না এবং অনবরত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করতেন। এভাবে একদিন স্ট্রোক করে মারা যান। তার অত্যাচার ও হয়রানিমূলক মামলার কারণে আমরা নিজেদের বাড়িতে যেতে পারছি না। মাকে নিয়ে আমরা এখন পালিয়ে থাকি।
অভিযুক্ত জাকির হোসেন তার বিরুদ্ধে মা ও ভাই বোনদের অভিযোগের বিষয়ে বলেন, আমার মাকে ভুল বুঝানো হয়েছে, আমিও কিছু ভুল করেছি। এজন্য আমি প্রয়োজনে মায়ের পা ধরে ক্ষমা চাইবো।
এ বিষয়ে নোয়াখালী আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন মাসুদ বলেন, ‘জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে তার মা আমাদের অফিসে দুই দফা লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। আমরা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছি। অভিযোগের সত্যতা পেলে তার আইনজীবী সহকারীর কার্ড বাতিল করাসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু তৈয়র মোহাম্মদ আরিফ হোসেন বলেন, মা ও ভাইদের বিরুদ্ধে জাকির হোসেনের দায়ের করা মামলাটি জেলা গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করছে। অভিযোগগুলো তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।