
কালবৈশাখীতে লণ্ডভণ্ড বগুড়া: গাছচাপায় ১ জনের মৃত্যু
দফায় দফায় আঘাত হানা কালবৈশাখী ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে বগুড়ার জনজীবন। শত শত ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং অন্তত সাতটি উপজেলায় ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। এসময় ঝড়ে গাছচাপায় এক ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে, ঝড়ে অন্তত ১ হাজার ১৬৫টি কৃষক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফসলের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ১৪ লাখ টাকা।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) ভোররাতে গাবতলী উপজেলার সুখানপুকুর ইউনিয়নের লাঠিগঞ্জ বাজারে ঝড়ের সময় একটি বড় বটগাছ উপড়ে পড়ে পানের দোকানের ওপর। এতে দোকানের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা উমা চন্দ্র (৫২) নামে এক ব্যবসায়ী ঘটনাস্থলেই নিহত হন।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে গাছ কেটে মরদেহ উদ্ধার করেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। গাবতলী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিব হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়েও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কালবৈশাখীর তাণ্ডবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়। বিশেষ করে শিবগঞ্জ, শেরপুর, ধুনট, শাজাহানপুর, সারিয়াকান্দি, গাবতলী ও সোনাতলা উপজেলায় বোরো ধান ও শাকসবজির ক্ষেত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২৮ হেক্টর জমির বোরো ধান এবং ১৫ হেক্টর জমির শাকসবজি আংশিক বা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রান্তিক কৃষকেরা। অনেকেই শেষ সম্বল হিসেবে চাষাবাদে বিনিয়োগ করেছিলেন।
শিবগঞ্জ ও সারিয়াকান্দি এলাকায় কয়েকশ ঘরবাড়ির টিনের চালা উড়ে গেছে। অনেক স্থানে বসতঘরের দেয়াল ধসে পড়েছে। গাছপালা উপড়ে বৈদ্যুতিক লাইনের ওপর পড়ায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জরুরি ভিত্তিতে লাইন মেরামতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, ক্ষতিগ্রস্ত অনেক এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা পৌঁছায়নি। বিশেষ করে কৃষকেরা দ্রুত প্রণোদনা ও পুনর্বাসন সহায়তা দাবি করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্থানীয় কয়েকটি পেজ ও ব্যক্তিগত আইডি থেকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। গাবতলীর লাঠিগঞ্জ বাজারে গাছচাপায় নিহত ব্যবসায়ীর ঘটনার পর স্থানীয়রা দ্রুত সহায়তার দাবি জানান। শিবগঞ্জ ও সারিয়াকান্দির বিভিন্ন এলাকায় টিনের চালা উড়ে যাওয়া, বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়া এবং কৃষিজমির ক্ষতির ভিডিওও ভাইরাল হয়।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. মোতাহার হোসেন বলেন, “এই ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে আমরা বর্তমানে অ্যাসেসমেন্ট কার্যক্রম পরিচালনা করছি। এখানে আমাদের সকল পিএও উপস্থিত আছেন এবং তাদের কাছ থেকে বিস্তারিত রিপোর্ট সংগ্রহ করা হচ্ছে। আজ এ বিষয়ে আমাদের একটি সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট হাতে পেলেই বিস্তারিত জানানো সম্ভব হবে।”
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বৈশাখ মাসজুড়ে আরও কালবৈশাখী ঝড় ও বজ্রপাতের আশঙ্কা রয়েছে। তাই কৃষকদের দ্রুত পাকা ধান ঘরে তোলা এবং সাধারণ মানুষকে ঝড়ের সময় নিরাপদ স্থানে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।