প্রকাশ: বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:২০ পিএম আপডেট: ২৯.০৪.২০২৬ ৭:৩০ পিএম (ভিজিট : ১১৯)

X
জীবনযুদ্ধে হার না মানা চার জয়িতা
জীবন মানেই সংগ্রাম। কিন্তু কিছু নারী আছেন, যারা প্রতিকূলতাকে পাথেয় বানিয়ে এগিয়ে যান। তারা নিজেদের জীবনের গল্পকে করে তোলেন অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা। আমাদের সমাজে এমন কিছু না রয়েছেন, যারা জীবনের কঠিন লড়াইয়ে হার না মেনে সমাজে সফল মানুষ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন। তাদের মধ্যে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার জান্নাতুল আদন, জোবাইদা বেগম, আসমা আক্তার রুনা ও ইসলাম খাতুন অন্যতম।
নির্যাতনের দুঃস্বপ্ন মুছে জীবন সংগ্রামে জয়ী: ২০০১ সালে সাতকানিয়া উপজেলার এওচিয়া ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন জান্নাতুল আদন। ২০১৯ সালে একাদশ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় পারিবারিকভাবে এক প্রবাসীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের দুই মাস পর তিনি জানতে পারেন তার স্বামী একজন নেশাগ্রস্ত। স্বামীর সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ করলেই শুরু হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। পরবর্তীতে তার স্বামী আর প্রবাসে না গিয়ে জুয়া খেলায় হেরে নিজের জায়গা-জমি বিক্রি করে দেন। একপর্যায়ে তাদেরকে পরিবার থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়। তখন হতাশাগ্রস্ত হয়ে তিনি অনেকবার আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। এরপর বিভিন্ন দুশ্চিন্তা এবং অবহেলার কারণে তার ছয় মাসের প্রিম্যাচিউর বেবি হওয়ার ৯ দিন পর মারা যায়। পরবর্তী সময়ে তার স্বামী এক বৃদ্ধ শিক্ষকের টাকা চুরি করার পর তিনি বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন। তারই প্রেক্ষিতে, ২০২০ সালে আইনিভাবে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। পরবর্তীতে মায়ের অনুপ্রেরণায় তিনি পুনরায় পড়ালেখার পাশাপাশি সামাজিক কাজে ফিরে আসেন। এরপর তিনি ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কোর্স সফলভাবে সম্পন্ন করেন। তিনি করোনাকালীন সময়ে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে টানা ৬ মাস ভ্যাকসিনেশনে অংশ নিয়ে মানুষকে সেবা দিয়েছেন। দেশের শীর্ষ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম রকমারি ডট কমে তার লেখা তিনটি একক বই প্রকাশিত হয়েছে। সাতকানিয়ার অসহায় ছাত্রীদের জন্য বন্যা ও রমজান উপলক্ষ্যে পরপর দু'বার ছাত্রী কল্যাণ ফান্ড গঠন ও তহবিল সংগ্রহ করে সহায়তা দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি নিজ উদ্যোগে চট্টগ্রাম নগরীতে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেখানে তিনি গরীব ও অসহায় নারীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন।
অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী: জোবাইদা বেগম বিবাহ পূর্ববর্তী সময়ে পারিবারিক চাপের মধ্যেও নিজের উদ্যোগে পড়ালেখার পাশাপাশি নিজ বাড়ির পার্শ্ববর্তী একটি পার্লারে কাজ শেখেন। বিবাহ পরবর্তী সময়ে স্বামীর অনুপ্রেরণায় ২০১১ সাল থেকে বিউটিফিকেশন ব্যবসা শুরু করেন। সাতকানিয়া পৌরসভায় পিনন বিউটি পার্লার নামক একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তার অর্থনৈতিকভাবে সফলতার যাত্রা শুরু হয়। পূর্বের কাজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কারণে পার্লারটি বেশ জনপ্রিয়তা পায়। ২০২৪ সালের শেষের দিকে তার স্বামী মারা যান। এরপর প্রতিবন্ধী ছেলের দেখাশোনা এবং পার্লার ভাড়া ও কর্মচারীর বেতন দেওয়ার পাশাপাশি সংসার চালোনো খুব কষ্টকর হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে পার্লারটি স্থানান্তর করে তিনি পুনরায় ঘুরে দাঁড়ান। বর্তমানে তার দোকানের তিনজন কর্মচারী রয়েছেন। এ ছাড়াও তার দুই কন্যা সন্তানের ভরণপোষণসহ সাংসারিক যাবতীয় খরচ এই পার্লারের মাধ্যমে আসা লভ্যাংশ থেকে নির্বাহ করেন।
শিক্ষা ও চাকুরীর ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী: পঁচিশ বছর বয়সী আসমা আক্তার রুনা জন্ম থেকে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি এবং তার এক ভাই দৃষ্টি প্রতিবন্ধি ছিলেন। তিনি ব্রেইল পদ্ধতির মাধ্যমে পড়ালেখা করেছেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকায় পড়ালেখার খরচ চালাতে খুব কষ্ট হয়েছে। একজন শিক্ষক ও তার খালা তাকে পড়ালেখার জন্য আর্থিকভাবে সহযোগিতা করতেন। তিনি ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। এরপর ২০১৮ সালে সহকারী শিক্ষক পদে আবেদন করে উত্তীর্ণ হন। এরপর ২০২০ সালে সাতকানিয়া উপজেলার জনার কেঁওচিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। চাকরিতে যোগদানের পর তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক হিস্ট্রি এন্ড কালচার বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর (১ম শ্রেণি) অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন।
সফল জননী: ২০০৫ সালে স্বামীকে হারান ইসলাম খাতুন। জীবন যুদ্ধে হার না মেনে তিনি মানুষের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ থেকে শুরু করে মাটি কাটা, পুকুর খনন ও ক্ষেত-খামারের কাজ পর্যন্ত করেছেন। এমনকি পাড়া-মহল্লায় ঘুরে ঘুরে মহিলাদের নিত্য প্রয়োজনীয় জুয়েলারি, পোশাক ও ছোট বাচ্চাদের খেলনা সামগ্রী বিক্রি করে চার ছেলেমেয়েকে পড়ালেখা করিয়েছেন। প্রথম সন্তান দিলোয়ারা বেগমের বিয়ের পর ডিভোর্স হয়ে গেলেও তিনি পুনরায় মেয়েকে বিয়ে দেন। এত সংগ্রামের পরও তার একক প্রচেষ্টায় দ্বিতীয় সন্তান সফিকুর রহমান ২০০৪ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর ২০০৭ সালে সফিক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি পদোন্নতি পেয়ে সেনাবাহিনীর কর্পোরাল হন। তিনি বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কুয়েতে দায়িত্বরত। তৃতীয় সন্তান কবিনা জান্নাত ২০১৮ সালে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিবার কল্যাণ সহকারী পদে যোগদান করেন। চতুর্থ সন্তান আবদুর রহিম ২০১৪ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চাকরি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি কর্পোরাল হিসেবে রামু সেনানিবাসে কর্মরত।