
X
আলহাজ লুৎফল হক
ইট-কাঠের দালান হয়তো সময়ের সাথে জীর্ণ হয়, কিন্তু মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করা প্রাণগুলো কখনো পুরোনো হয় না। বরেন্দ্র অঞ্চলের শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবায় এমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম মো. আলহাজ লুৎফল হক। তিনি কেবল একজন মানুষ নন, বরং একটি জনপদের শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের কারিগর।
তিনি ১৯০৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার মালদহ জেলার ইমাম নগর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মো. দেরাশতুল্লাহ মণ্ডলের ৬ ছেলে ও ১ মেয়ের মধ্যে লুৎফল হক ছিলেন তৃতীয়। শৈশব থেকেই তার ভেতর পরোপকারী মনোভাবের বীজ বপন হয়েছিল।
একজন উচ্চমাধ্যমিক পাস করা মানুষ হিসেবে সেই সময়েই তিনি অনুধাবন করেছিলেন, শিক্ষা ছাড়া জাতির মুক্তি অসম্ভব। নাচোলের শিক্ষা বিস্তারে তার ভূমিকা ছিল কিংবদন্তীতুল্য।
নাচোলের মুন্সী হযরত আলী উচ্চ বিদ্যালয় লুৎফল হকের অক্লান্ত প্রচেষ্টার প্রথম ফসল। মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে মুন্সী হযরত আলী উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন 'আল জামিয়াতুল মারকাযিয়া দারুল উলুম আল ইসলামিয়া' মাদ্রাসার দাতা ও প্রতিষ্ঠাতা তিনি।
এছাড়া উচ্চশিক্ষা প্রসারে তিনি নাচোল সরকারি ডিগ্রি কলেজে দুই বিঘা জমি দান করেন। প্রাথমিক শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে নিজ গ্রাম খেসবায় প্রতিষ্ঠা করেন প্রাথমিক বিদ্যালয়।
লুৎফল হক পেশায় ছিলেন একজন হোমিও চিকিৎসক। সেবার ব্রত নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন ‘হোমিও দাতব্য চিকিৎসালয়’। নাচোলে তার এই দাতব্য চিকিৎসালয়টি আজও তার স্মৃতি বহন করছে। ১৯৮৭ সালে স্থাপিত এই প্রতিষ্ঠানটি থেকে তিনি অসহায় ও দরিদ্র মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদান করতেন। কেবল ওষুধ নয়, আর্তমানবতার সেবায় তার দুয়ার ছিল সবসময় উন্মুক্ত।
বিশেষ করে তার মৃত্যুর পর দীর্ঘ ১৮ বছর থেকে বন্ধ রয়েছে নিজ প্রতিষ্ঠিত দাতব্য চিকিৎসালয়। দেড় দশক সময় পার হলেও মাদ্রাসা কমিটি বা এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে চালু করার কোন কাযর্কর পদক্ষেপ গোড়ে তোলা হয় নি।
লুৎফল হক আমৃত্যু মানুষের কাজ করে গেছেন। সমাজ সংস্কারের পাশাপাশি তিনি দরিদ্র মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে একটি হোমিও দাতব্য চিকিৎসালয় পরিচালনা করতেন। নিজের ব্যক্তিগত চেষ্টায় চিকিৎসার মাধ্যমে বিনামূল্যে ঔষধ ও পরামর্শ প্রদান করতেন।
এলাকাবাসীর সুত্রে জানা গেছে লুৎফল হকের জীবদ্দশায় পাশ্ববর্তী গ্রামগুলোর নিম্নবিত্ত মানুষেরা বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও ঔষধ গ্রহন করত। কিন্তু ২০০৭ সালের ২২ অক্টোবর তার প্রয়াণোর পর এই চিকিৎসালয়টির কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ যে মাদ্রাসা চত্বরে এই সেবা মূলক কাজ চলত সেই মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও পরিচালনা কমিটি দাতব্য চিকিৎসালয়টি চালু করার কোন উদ্যোগ নেয়নি।
দাতব্য চিকিৎসালয়টি বন্ধ থাকায় স্থানীয়রা এবং লুৎফল হকের শুভাকাঙ্ক্ষী ও সাধারণ মানুষের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা মনে করেন প্রতিদানের দাতা ও প্রতিষ্ঠাতার স্মৃতি ধরে রাখতে এবং জনস্বার্থে এই চিকিৎসালয়টি দ্রুত সচল করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন বিনয়ী ও ন্যায়ের প্রতীক। সমাজসেবা, বিচার-সালিশ এবং পরোপকারে তার খ্যাতি ছিল আকাশচুম্বী। এতিম, অসহায় এবং গৃহহীন মানুষের আশ্রয়স্থল ছিলেন তিনি। আমৃত্যু তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের লড়াইয়ে।
২০০৭ সালের ২২ অক্টোবর এই মহৎ প্রাণ পরলোকগমন করেন। শতবর্ষের দীর্ঘ জীবনে তিনি যে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে গেছেন এবং সেবার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা নাচোল তথা বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান থাকবে।
"মানুষ বাঁচে তার কর্মের মধ্যে, বয়সের মধ্যে নয়।" আলহাজ লুৎফল হকের জীবন যেন এই প্রবাদেরই এক বাস্তব প্রতিফলন।