
X
ফাইল ছবি
“কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ” প্রচলিত এই প্রবাদটি যেন নির্মম বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলায়। একদিকে মাদক কারবারিদের অবৈধ অর্থের পাহাড়, অন্যদিকে ভয়াল নেশার ছোবলে ধ্বংসের কিনারায় দাঁড়িয়ে পুরো তরুণ সমাজ। মাদকের থাবা এখন আর কেবল সামাজিক অবক্ষয়ের বিষয় নয়; এটি রূপ নিয়েছে এক নীরব মৃত্যুফাঁদে, যেখানে প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য শিক্ষার্থী ও যুবকের ভবিষ্যৎ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অস্থির পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে উপজেলায় সক্রিয় হয়ে ওঠে একাধিক সংঘবদ্ধ মাদক সিন্ডিকেট। আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা, প্রশাসনিক শৈথিল্য এবং নজরদারির ঘাটতিকে পুঁজি করে এসব চক্র গড়ে তোলে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। এ অবস্থায় মদ, গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা, হেরোইন, হুইস্কি, বিয়ারসহ বিভিন্ন নেশাজাতীয় ট্যাবলেট প্রকাশ্যে বিক্রি করছে মাদক ব্যবসায়ীরা। তাদের জন্য যেন এখন ‘পৌষ মাস’ চলছে। অথচ সরকার পরিবর্তনের পরও দৃশ্যমান কোনো কঠোর অভিযান না থাকায় হতাশ সাধারণ মানুষও।
স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এখন প্রকাশ্যেই মাদক বেচাকেনার সম্ভাব্য ‘হটস্পট’-এ পরিণত হয়েছে। বড়বাজার বাসস্ট্যান্ড, কামালখানী জীপ স্ট্যান্ড, ইনাতখানীর কিছু অংশ, আদর্শ বাজার সংলগ্ন মাতাপুর-তকবাজখানী এলাকা, রঘু চৌধুরীপাড়া, ভূমি অফিস মোড়, টাম্বুলীটুলা স’মিল এলাকা, এড়ালিয়ার মাঠ সংলগ্ন সড়ক, বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় রোড, সাগরদিঘীর দক্ষিণ পাড়, জনাব আলী সরকারি কলেজের পেছন, ছিলাপাঞ্জা মোড়, ঠাকুরাইন দিঘীর ব্রিজ এলাকা, বাংলালিংক টাওয়ার সংলগ্ন স্থান, খাদ্য গুদামের পেছন, মহিলা কলেজ রোড ও পাড়াগাঁও বউবাজার এসব এলাকায় সন্ধ্যা নামলেই শুরু হয় মাদকসেবী ও কারবারিদের দৌরাত্ম্য।
এছাড়া দক্ষিণ যাত্রাপাশার ভাঙ্গার পাড়, পশ্চিম যাত্রাপাশার গড়পাড়, গ্যানিংগঞ্জ বাজারের দক্ষিণ পুকুরপাড়, পাঠানটুলা, মধ্য যাত্রাপাশার মালেরহাটি ও বটের বাড়ির মধ্যাংশ (উত্তর-দক্ষিণ), বাইন্না মহল্লা ও কুন্ডুরপাড় ব্রিজ এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ভাসমানভাবে চলছে মাদক কেনাবেচা ও সেবনের অভিযোগ।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো মাদকের এই বিস্তার এখন আর উপজেলা সদরেই সীমাবদ্ধ নেই; প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এর ভয়াবহতা। সহজলভ্য মাদক কিশোর ও তরুণদের টেনে নিচ্ছে অন্ধকার জগতে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও জড়িয়ে পড়ছে নেশার করাল গ্রাসে। নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেকেই বেছে নিচ্ছে চুরি, ছিনতাই ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। ফলে পুরো উপজেলায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে অপরাধ প্রবণতা।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, দ্রুত অর্থ উপার্জনের লোভে অনেক যুবক বৈধ জীবিকার পথ ছেড়ে জড়িয়ে পড়ছে মাদক ব্যবসায়। দিনে কিছুটা আড়ালে থাকলেও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয় হয়ে ওঠে এসব চক্র। স্থানীয়রা সবকিছু দেখেও ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পান না। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবাদ করলেই হামলা কিংবা হয়রানির শিকার হতে হয়। এমনকি কিছু অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরও এসব চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সচেতন মহলের মতে, মাদক কেবল একজন মানুষকে ধ্বংস করে না; এটি ধ্বংস করে একটি পরিবার, একটি সমাজ, এমনকি একটি প্রজন্মকেও। দীর্ঘদিন ধরে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর ও ধারাবাহিক অভিযানের অভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া ও কিছু অসাধু ব্যক্তির মদদেই এই অবৈধ ব্যবসা বিস্তার লাভ করছে।
তাদের দাবি, মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের সমন্বয়ে গড়ে তুলতে হবে শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ।
এ বিষয়ে বানিয়াচং থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শেখ নাজমুল হক বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।” এছাড়াও মসজিদ মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় মাদকের কুফল সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করা হবে।
জেলা মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাব-ইন্সপেক্টর মীরা রানী দেবী বলেন, “মাদক নিয়ন্ত্রণে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। তবে জনগণ সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করলে মাদক নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হবে। সচেতন নাগরিকরাই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।”