
X
ভ্যানের হাতল ছেড়ে বই খাতা নিয়ে আবারও স্কুলে ফিরেছে শিশু জুনায়েদ
দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন বাবা, মা ও চলে গেছে অন্য যুবকের হাত ধরে। কোন কুল কিনারা না পেয়ে তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র জুনায়েদ বাবার রেখে যাওয়া সম্বল ভ্যান গাড়িটির হাতল ধরেছিল দুই ভাইবোন ও দাদা দাদীর মুখে অন্য যোগাতে। বিষয়টি স্থানীয় এক কলেজ শিক্ষক ও অভিনয় শিল্পী সামছুল আলমের প্রচেষ্টায় সংবাদকর্মীরা বিভিন্ন গণমাধ্যমে তুলে ধরলে উপজেলা প্রশাসন এবং দেশের ও প্রবাসের সুহৃদয়ের মানূষ সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেন। সকলের প্রচেষ্টায় ভ্যানের হাতল ছেড়ে জুনায়েদ এখন আবার ফিরেছে বিদ্যালয়েরর আঙিনায়।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর ইউনিয়নের রঘুনাথপুর মিস্ত্রিপাড়ার বাসিন্দা জুনায়েদের বাবা হাবিবুর রহমান হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় গেল ঈদুল ফিতরের দিন মারা যান। এর আগে মা রোজিনা খাতুন স্বামীর চিকিৎসার জন্য জমানো টাকা নিয়ে এক যুবকের সাথে চলে যান। পরিবারে ছিল জুনায়েদ আর তার দুই ভাইবোন এবং বৃদ্ধ দাদা-দাদি। নিঃস্ব পরিবারটি রক্ষায় তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র জুনায়েদ বাবার ভ্যান নিয়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়। তার এই জীবনযুদ্ধ নাড়া দিয়েছিল অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে। সংবাদটি প্রচারের পরপরই প্রবাসীসহ অনেকে জুনায়েদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পাঠিয়েছেন।
যার ফলে ঘরের কোনে অবহেলায় পড়ে থাকা নতুন শ্রেণির নতুন বইগুলো এখন তার পড়ার টেবিলে। তার ১২ বছর বয়সী বড় ভাই এবং ছোট বোনের পড়াশোনার দায়িত্বও নিতে চেয়েছেন দানশীল ব্যক্তিগণ। প্রাপ্ত আর্থিক অনুদানে এখন তাদের অন্ন ও দাদা-দাদির ওষুধের চাহিদা পূরণ হচ্ছে। নতুন পোশাক পেয়েছে জুনায়েদ ও তার ভাই-বোন। তিন ভাইবোনই এখন নিয়মিত স্কুলে যাতায়াত করছে।
জুনায়েদের দাদি সপাজান নেছা কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, ছেলেটা মারা যাওয়ার পর আমরা চোখে অন্ধকার দেখছিলাম। ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে কোথায় যাব, কী খাব– তার কোনো দিশা ছিল না। জুনায়েদ যখন ভ্যান নিয়ে বের হতো, বুকটা ফেটে যেত। এখন অনেক মানুষ আমাদের সাহায্য করছেন। তাদের সাহায্যে এখন আমার নাতি-নাতনিরা আবার স্কুলে যেতে পারছে। আমরা এখন দুই মুঠো খেতে পারছি।
চোখেমুখে আগামীর স্বপ্ন নিয়ে জুনায়েদ জানায়, যেদিন থেকে সে ভ্যানের হাতল ধরেছে তারপর সে ভাবেনি আবার স্কুলে যেতে পারবে। ভ্যান চালাতে খুব কষ্ট হতো, কিন্তু এ ছাড়া তার উপায়ও ছিল না। এখন অনেক মানুষ সাহায্য করায় সে বড় হয়ে মানুষের মতো মানুষ হতে চায়।
কলেজ শিক্ষক ও অভিনয় শিল্পী সামছুল আলম জানান, জুনায়েদদের পরিবারের ওপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেছে, সেটি কল্পনাতীত। ছোট বাচ্চাটা যখন রোদ-বৃষ্টির মধ্যে বড়দের মতো ভ্যান টেনে নিয়ে যেত, আমাদের দেখে খুব কষ্ট হতো, মায়া লাগত।
জুনায়েদের ক্লাসে ফেরা নিয়ে প্রাগপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েরর প্রধান শিক্ষক শাহাবুদ্দিন বলেন, জুনায়েদ অত্যন্ত মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের ছেলে। পারিবারিক বিপর্যয়ের কারণে সে হঠাৎ করেই স্কুলে আসা বন্ধ করে দিয়েছিল।
খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, পেটের তাগিদে তাকে ভ্যান চালাতে হচ্ছে। একজন ছাত্রের এই অসহায়ত্ব আমাদের খুব ব্যথিত করেছিল। বিভিন্ন মহলের সহায়তায় সে আবার ক্লাসে ফিরেছে, শিক্ষক হিসেবে এটি আমাদের জন্য চরম আনন্দের।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মি: অনিন্দ্য গুহ জানান, জুনায়েদ ও তার ভাইবোনের পড়াশোনা যাতে আর বাধাগ্রস্থ না হয়, সে বিষয়ে আমরা নিয়মিত তদারকি করছি। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সকল ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।