
X
হরিরামপুরের দুর্গম চরাঞ্চল
পদ্মার বুকে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চর। চারদিকে নদীর গর্জন, ভাঙনের ভয় আর দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে টিকে থাকা মানুষের জীবন। সেই সংগ্রামের মাঝেই মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার দুর্গম আজিমনগর ইউনিয়নের বাসিন্দাদের মধ্যে ছড়িয়েছে জমি দখল আর চাঁদাবাজির আতঙ্ক।
চরের মানুষের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে একটি চক্র অসহায় মানুষের ফসলি জমি দখল করে নিচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করলে হুমকি, চাঁদা দাবি, এমনকি হামলারও শিকার হতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে বহু পরিবার জমিজমা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। স্থানীয়ভাবে প্রতিকার না পেয়ে ভুক্তভোগীরা এবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বরাবর অভিযোগ লিখেছেন। দুর্গম চরাঞ্চল হওয়ায় সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি কম। আর সেই সুযোগেই একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী এলাকায় দখল ও ভয়ভীতির রাজত্ব গড়ে তুলেছে।
স্থানীয়দের দাবি, ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের অনুসারীরা এলাকায় একটি ‘ভূমিদস্যু বাহিনী’ গড়ে তুলেছে।
চরের এনায়েতপুর গ্রামের বাসিন্দা আতিয়ার হোসেনসহ এলাকাবাসী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জমি দখল আর চাঁদাবাজির ঘটনা আরও বেড়ে গেছে।
আজিমনগর চরে গিয়ে কথা হয় কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে। তাদের ভাষ্য, জমি হারানোর ভয় আর নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটছে পুরো এলাকার মানুষের।
শিকারপুর গ্রামের বাসিন্দা লালমিয়া বলেন, “সরকার পরিবর্তনের পর আমার ৯ বিঘা ফসলি জমি দখল করে নেয়। আমরা গরিব মানুষ, কার কাছে বিচার দেব?”
এনায়েতপুর গ্রামের সোবহান খান প্রায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ৩০ বছর ধরে আমি জমিটা চাষ করছি। আমার শ্বশুর আমাকে দিয়েছিলেন। সব কাগজপত্র আছে। তারপরও দুই বছর ধরে জমি দখল করে রেখেছে। বিচার চাইতে গেলে বলে আমি সরকার।
আরেক ভুক্তভোগী শেখ তাইজুদ্দিন বলেন, দিনদুপুরে আমার দুই একর জমি দখল করে নেয়। বাধা দিতে গেলে উল্টো ভয় দেখানো হয়।
ভুক্তভোগী মুন্নাফ জমাদ্দার বলেন, জমি দখলের পর বিচার চাইতে গিয়েছিলাম। তখন ৭০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে কোনো সমাধান হবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়।
একই গ্রামের মতিয়ার বলেন, আমি কলাবাগান করে সংসার চালাই। ৫ লাখ টাকা চাঁদা চেয়েছিল। আমি তাদের বলেছিলাম আমাকে সময় দিন আমার কলা বাগানে করা আছে বিক্রি করে আমি আপনাদের চাঁদার টাকা দিয়ে দিবো। কিন্তু টাকা দিতে না পারায় আমার কলাগাছ কেটে ফেলে, নতুন একটি ট্রলার বানিয়ে রেখেছিলাম এনায়েতপুর বাজারে সেই ট্রলার ভেঙে পুকুরে ফেলে দেয়। আমি এর বিচার চাই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে ওঠে। ওই সময় ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান বেল্লাল হোসেনের বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। এরপর থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়।
অভিযোগ অস্বীকার করে সামছুদ্দিন মেম্বার বলেন, যারা অভিযোগ করছে তারা আওয়ামী লীগের লোক। এটা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। তদন্ত করলেই সত্য ঘটনা সবার সামনে আসবে।
হরিরামপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি হান্নান মৃধা বলেন, জমি দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ সত্য নয়। যারা অভিযোগ দিয়েছেন তারা আওয়ামী লীগের নেতা।
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির মুখপাত্র নুরতাজ আলম বাহার বলেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সিংগাইর সার্কেল) ফাহিম আসজাদ বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।