
X
ফাইল ছবি
স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগামী ডিসেম্বরে হবে, সরকারের পক্ষ থেকে এমন ঘোষণার পরই রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রস্তুতি শুরু করেছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি ইতোমধ্যে সারাদেশে তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। তবে সরকারি দল বিএনপি এক্ষেত্রে অনেকটাই নীরব।
সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের এই নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াত ও এনসিপি তাদের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নিজেদের প্রার্থীকে তারা পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে ব্যাপক প্রচারণা।
রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করে নাম ঘোষণা করেছে।
এছাড়া এনসিপি এরই মধ্যে ১০০ উপজেলা ও পৌরসভায় নিজেদের চেয়ারম্যান ও মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। জামায়াতেরও প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত।
তবে দেশের অন্যতম বৃহৎ দল বিএনপি এখনো নীরব। দলের হাইকমান্ড থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয়নি। দলটির নীতি-নির্ধারকরা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিএনপির প্রস্তুতি রয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় কাজ করছেন।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে দল প্রার্থী চূড়ান্ত করবে। হাইকমান্ডের ঘোষণা না থাকলেও দলটির স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা বসে নেই। তারা নিজেদের মতো করে এলাকায় প্রচারণা চালাচ্ছেন। এক্ষেত্রে প্রতি এলাকাতেই দলটির একাধিক প্রার্থী মাঠে রয়েছেন।
এবার দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না স্থানীয় সরকার নির্বাচন। আর নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকায় সরকারি দলের চেয়ে বিরোধী দল-সমর্থিত প্রার্থীরাই বেশি সুবিধা পেতে পারেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। কারণ, বিরোধী দল এরই মধ্যে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের সমর্থিত একক প্রার্থী চূড়ান্ত করছে।
কিন্তু সরকারি দলের পক্ষে এভাবে একক প্রার্থী ঠিক করা খুবই কঠিন। উপজেলা, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, সবখানেই সরকারি দল-সমর্থিত একাধিক প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপিকে এবার এক অন্যরকম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।
দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিকে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। পুলিশ ও প্রশাসনের সহায়তায় নির্বাচনে জয়লাভের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার কঠোর বার্তাও তিনি দল এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে দিয়েছেন।
ফলে বিএনপিকে জনমত তথা ভোটারদের মন জয় করেই নির্বাচনে জয়লাভ করতে হবে। মাঠপর্যায়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি।
এ ছাড়া দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হওয়ায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের অপেক্ষাকৃত ‘ক্লিন ইমেজ’-সম্পন্ন স্থানীয় প্রভাবশালীরাও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকতে পারেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। সব মিলিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপিকে নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
আলোচিত নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দলীয় প্রতীক ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনের যে সিদ্ধান্ত হয়েছে তাতে মাঠপর্যায়ে সঠিক জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে সরকারি দলের জন্য এ নির্বাচন খুবই চ্যালেঞ্জ হবে। দলীয় প্রতীক না থাকায় তাদের একাধিক প্রার্থী থাকবে এ জন্য বিরোধী দল-সমর্থিত প্রার্থীরা সুবিধা পেতে পারেন।
সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদসহ সব ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায় রয়েছে। দলটি সারা দেশে প্রার্থী তালিকা প্রায় ঠিক করে ফেলেছে।
জাতীয় সংসদের কার্যক্রম শুরু হওয়ায় পরপরই স্থানীয় সরকার কাঠামোর নির্বাচনের ঘোষণা দেবে সরকার, জামায়াতে ইসলামী এমনটিই মনে করেছিল। কিন্তু সরকার সে পথে না হেঁটে বিভিন্ন জায়গায় দলীয় নেতাদের প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। এতে জামায়াত সরকারের ব্যাপক সমালোচনা করছে এবং দ্রুত নির্বাচনের দাবিতেও তারা সোচ্চার রয়েছে। এর পাশাপাশি তারা সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকার কাঠামোর সব জায়গায় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলীয় সূত্র মতে, দলের মধ্যে দফায় দফায় আলাপ-আলোচনার পর সম্ভাব্য প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে।
প্রার্থীরা মাঠে আছেন এবং নির্বাচনের গ্রাউন্ড ওয়ার্ক বলতে যা বোঝায়, এখন তারা তা-ই করছেন। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে জামায়াত ইতোমধ্যে তাদের দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে।
এর মধ্যে ঢাকা উত্তরে জামায়াতের মেয়র প্রার্থী দলটির মহানগরের আমির সেলিম উদ্দিন এবং ঢাকা দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী হিসেবে নতুন প্রজন্মের জনপ্রিয় নেতা ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমের নাম ঘোষণা করেছে। এছাড়া উপজেলাগুলোয় চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান এবং পৌরসভায় মেয়র ও কাউন্সিলর নির্বাচনের জন্য নীরবে গণসংযোগ করে যাচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা।
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ওয়ার্ড-মেম্বার পর্যন্তও প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্ত করছে জামায়াত। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন মহিলা প্রার্থীও রয়েছেন।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রচার মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জোবায়ের বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আমাদের প্রার্থী বাছাই অনেকটাই সম্পন্ন হয়েছে।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে প্রার্থী চূড়ান্ত করে ইতোমধ্যে নাম ঘোষণা করা হয়েছে। বলা যায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য আমাদের সার্বিকভাবে সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।
এদিকে গত ১০ মে এনসিপি সংবাদ সম্মেলন করে দেশের ১০০টি উপজেলা ও পৌরসভায় নির্বাচনের জন্য দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ৩৩টি পৌরসভার মেয়র, ৬৭টি উপজেলার চেয়ারম্যান পদে দলটি প্রার্থী ঘোষণা করেছে।
আসন্ন ঈদুল আজহার আগে আগামী ২০ মে আরো ১০০ উপজেলা ও পৌরসভায় প্রার্থী ঘোষণা করবে বলে দলটির নেতারা জানিয়েছেন। এর আগে গত ২৯ মার্চ ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনসহ দেশের পাঁচটি সিটি করপোরেশনের আসন্ন নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে এনসিপি। শিগগিরই অন্য আটটি সিটি করপোরেশনে প্রার্থী ঘোষণা করা হবে বলে দলটির নেতারা জানিয়েছেন।
এর মধ্যে দলটি ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের মেয়র হিসেবে দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সচিব ভূঁইয়া এবং উত্তরের মেয়র হিসেবে দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিবের নাম ঘোষণা করেছে। তারা ইতোমধ্যে বিভিন্নভাবে নির্বাচনী প্রচারণাও চালিয়ে যাচ্ছেন।
এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান সারজিস আলম বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্য আমরা পর্যাপ্ত সময় পাইনি।
দলের সাংগঠনিক ভিত্তিও তখন সব জায়গায় প্রত্যাশা অনুযায়ী শক্তিশালী ছিল না। সেই জায়গা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা স্থানীয় নির্বাচনের ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু করেছি। আশা করছি, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমরা ভালো করব।