
X
ছবি: প্রতিনিধি
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে গবাদিপশুর পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন ভোলার প্রায় সাড়ে ১১ হাজার খামারি। তবে ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা।
এবছর কুরবানির পশু কেনাবেচাকে ঘিরে দ্বীপজেলা ভোলায় প্রায় ৯৫১ কোটি টাকার বাণিজ্যের আশা জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের।
ভোলা জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য মতে, জেলায় এ বছর কুরবানির জন্য মোট ১ লাখ ৩ হাজার ১৭টি গবাদিপশু প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে গরু রয়েছে ৬৫ হাজার ২৭১টি, মহিষ ৪ হাজার ৭২০টি, ছাগল ২৬ হাজার ৪১৮টি এবং ভেড়া রয়েছে ৫ হাজার ৬০৮টি। এর বিপরীতে চাহিদা রয়েছে ৮১ হাজার ১৮০টি এবং উদ্বৃত্ত রয়েছে ২১ হাজার ৮৩৭টি গবাদিপশু। ভোলায় মোট ১৪৯টি হাটে চলবে কেনাবেচা।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরে কমেছে কুরবানির পশুর চাহিদা। গত বছর ভোলা জেলায় মোট কুরবানির জন্য প্রস্তুত গবাদিপশু ছিল ৯২ হাজার ৪৫০টি। এর মধ্যে কুরবানি হয়েছে ৮৫ হাজার ১১টি। অর্থাৎ চাহিদা কমেছে ৩ হাজার ৮৩১টি পশু। তবে শেষ মুহূর্তে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ।
সরেজমিনে ভোলা সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের বড় তিনটি গরুর খামার ঘুরে দেখা যায়, হাট শুরু হওয়ার আগে শেষ মুহূর্তে পরম যত্নে গরুগুলোর পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারি ও খামারের শ্রমিকরা। কেউ দেশি-বিদেশি কাঁচাঘাস, নানা ধরনের ভুসি, খড়সহ অন্যান্য দেশীয় খাবার খাওয়াচ্ছেন।
আবার কেউ কেউ খামার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে গরুগুলো গোসল করিয়ে পরিষ্কার করে রাখছেন।
খামারি মোহাম্মদ আলী বলেন, “আমি একজন কৃষক। কৃষির ওপর নির্ভর করেই আমার পরিবার চলে। প্রতিবছর কুরবানির ঈদে খামারের গরু বিক্রি করেই সারা বছর চলি। এ ঈদে বিক্রির উদ্দেশ্যে আমার খামারের প্রায় ১৬ মণের ‘জমিদার’সহ মোট ৬টি গরু প্রস্তুত করেছি। তবে গোখাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে।
তারপরও খরচের তুলনায় ন্যায্য বাজারমূল্যে গরুগুলো বিক্রি করতে পারলে লাভবান হব, না হলে লোকসান হবে। তবে বড় গরুগুলো বিক্রি করে পুনরায় ছোট গরু কিনে লালন-পালন করব।”
তিনি আরও বলেন, “খামারের গরু হচ্ছে আমাদের মতো গরিব মানুষের বিশ্বস্ত ব্যাংক। অল্প অল্প করে সঞ্চয় করি, একসঙ্গে লাভসহ মূলধন ফেরত পাই।”
খামারের শ্রমিক রুবেল ও কাশেম বলেন, “খামার মালিকদের নির্দেশনা অনুযায়ী দিন-রাত গরুগুলো অনেক কষ্টে লালন-পালন করেছি আমরা। বিনিময়ে পারিশ্রমিক নিলেও গরুগুলোর প্রতি অনেক মায়া জন্মেছে।
বিক্রির উদ্দেশ্যে হয়তো দুই-তিন দিন পর হাটে উঠাবো, এটা ভেবে কষ্ট হচ্ছে। কিছু করার নেই। তারপরও আমরা চাই খামার মালিক লাভবান হোক। এতে আমরা আবারও কাজ করে খেতে পারব।”
খামারি দুলাল বেপারি বলেন, “আমার জানামতে ভোলায় এখন পর্যন্ত আমার খামারেই সবচেয়ে বড় গরু আছে ‘কালাচান’। এরপর রয়েছে ‘সাদাচান’। এছাড়া মোট ১০টি গরু আছে, এর মধ্যে ৯টি বিক্রি করব। সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতিতে পরম যত্নে গরুগুলো বড় করেছি। স্থানীয় হাটগুলোতে দেশি গরুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আশা করি ন্যায্য দামেই বিক্রি করতে পারব।
প্রতি বস্তা দানাদার গোখাদ্যের দাম ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আমরা বাধ্য হয়েই কিনেছি। তারপরও আশা করি ন্যায্য দামেই গরুগুলো বিক্রি করতে পারব। আগামী ৩-৪ দিনের মধ্যে হাট পুরোপুরি জমে উঠবে।”
তিনি আরও বলেন, “যদি ভোলার হাটগুলোতে পাশ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে অবৈধভাবে গরু প্রবেশ করানো হয়, তাহলে আমাদের দেশি গরুর দাম কমে যাবে। ফলে আমরা দেশি গরুর ন্যায্য দাম পাব না। এতে মারাত্মকভাবে খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হব।”
এসব বিষয়ে ভোলা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম খাঁন জানান, “এবছর ভোলা জেলায় প্রায় ১ লাখ ৩ হাজার কুরবানির পশু প্রস্তুত আছে। চাহিদার তুলনায় আমাদের উদ্বৃত্ত প্রায় ২১ হাজার, যা অন্যান্য জেলায় বিক্রি করতে পারবেন খামারিরা।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এসব গবাদিপশু সম্পূর্ণ সুস্থ-সবল ও দেশীয় পদ্ধতিতে লালন-পালন করা হয়েছে। এবছর প্রায় ৯৫১ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যের আশা করছি। এছাড়া কুরবানির পশুর হাটে আমাদের ২৪টি মেডিকেল টিম থাকবে।”
ভোলা জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া সেল) মো. মনিরুজ্জামান জানান, “অবৈধ স্টেরয়েড প্রয়োগের মাধ্যমে মোটাতাজাকৃত পশু অর্থাৎ ভেজাল ও রুগ্ণ পশুর কারণে যেন ক্রেতাদের কুরবানির মহৎ উদ্দেশ্য ম্লান না হয়, সেদিকে নজর রেখে ভোলা জেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছে।
এছাড়া ভোলার কুরবানির পশুর হাটগুলোতে জাল টাকার লেনদেন রোধে জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমূহ একযোগে কাজ শুরু করেছে বলেও জানান।”