
X
ছবি: প্রতিনিধি
কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন নওগাঁ জেলার খামারিরা। বছরের সবচেয়ে বড় পশুর বাজারকে ঘিরে গবাদিপশু লালন-পালন, পরিচর্যা ও মোটাতাজাকরণে দিন-রাত পরিশ্রম করছেন তারা। তবে পশুখাদ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে লাভের হিসাব নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন প্রান্তিক থেকে বড়—সব খামারিরাই।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নওগাঁ জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩৮ হাজার ৯০৯ জন খামারি রয়েছেন। সামনে কোরবানির ঈদ উপলক্ষে জেলায় প্রায় ৮ লাখ গবাদিপশু প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে ষাঁড়, বলদ, গাভী, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায়। জেলার নিজস্ব চাহিদা প্রায় ৩ লাখ ৮৭ হাজার পশু। বাকি প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজারের বেশি পশু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামে সরবরাহ করা হবে।
ঈদ সামনে রেখে খামারগুলোতে এখন বাড়তি যত্নে পালন করা হচ্ছে দেশি জাতের গরু, শাহীওয়ালসহ বিভিন্ন উন্নত জাতের পশু। খামারিরা জানান, কৃত্রিম উপায়ে নয়, বরং প্রাকৃতিক খাদ্য ব্যবহার করেই গরু মোটাতাজা করা হচ্ছে। আটা, ভুসি, খৈল, খড় ও সবুজ ঘাসের সমন্বয়ে পশুর খাদ্যতালিকা তৈরি করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এসব দানাদার খাদ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে।
নওগাঁ সদর উপজেলার বর্ষাইল ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের খামারি একরামুল হাসান জানান, তার খামারে বর্তমানে ১০৬টি গরু রয়েছে, যার অধিকাংশই শাহীওয়াল জাতের। প্রতিটি গরুর মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় দেড় লাখ থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত। এছাড়াও রয়েছে ৩১টি খাসি। তার খামারে স্থায়ীভাবে সাতজন শ্রমিক কাজ করছেন।
তিনি বলেন, “প্রাকৃতিকভাবে গরু মোটাতাজা করতে অনেক যত্ন নিতে হয়। দিনে তিনবার নিয়ম করে খাবার দিতে হয়। কিন্তু কয়েক মাসের ব্যবধানে পশুখাদ্যের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাজারে সবকিছুর দাম বাড়লেও যদি পশুর ন্যায্য মূল্য না পাওয়া যায়, তাহলে খামারিদের লোকসান গুনতে হবে।”
একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন ছোট খামারি উজ্জ্বল হোসেনও। তিনি বলেন, “প্রতি বছর কোরবানির ঈদ উপলক্ষে পাঁচ থেকে সাতটি গরু পালন করি। এবারও পাঁচটি গরু প্রস্তুত করছি বিক্রির জন্য। তবে গত তিন মাসে খাদ্যের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে ছোট খামারিদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।”
তার ভাষায়, “আগে ৫০ কেজির খুদের বস্তা কিনতে ১ হাজার ৮০০ টাকা লাগত, এখন সেটি ২ হাজার টাকা। ১ হাজার ৭০০ টাকার ব্র্যান্ডের খাবার এখন ২ হাজার ২০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এছাড়া ৮০০ টাকার ফিড এখন ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এভাবে দাম বাড়তে থাকলে ছোট খামারিদের পক্ষে গরু পালন করা খুব কঠিন হয়ে যাবে।”
এ বিষয়ে নওগাঁ সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, “গবাদিপশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এজন্য নিয়মিত কৃমিনাশক ও টিকা প্রদান করা হচ্ছে সরকারি ব্যবস্থাপনায়। তবে পশুখাদ্যের একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব বাজারে পড়ছে।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে খাদ্য আমদানিতে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। ফলে দাম বেড়েছে। খাদ্য সহজলভ্য ও সহনীয় পর্যায়ে রাখতে পারলে খামারিরা আরও বেশি লাভবান হবেন।”
নওগাঁ জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ট্রেনিং অফিসার ডা. গৌরাঙ্গ কুমার তালুকদার জানান, প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে পশু পালন ও মোটাতাজাকরণে খামারিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত মাংস উৎপাদনও নিশ্চিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, “প্রাকৃতিক উপায়ে লালন-পালন করা পশুর প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহও বেশি থাকে। এতে যেমন ভোক্তারা ভালো মানের মাংস পান, তেমনি খামারিরাও লাভবান হন। পাশাপাশি অবৈধভাবে যাতে দেশের বাইরে থেকে কোনো পশু প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়েও কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে।”