আদালতে আসামি স্বপ্নাকে দেখিয়ে যা বললেন রামিসার মা

অনলাইন ডেস্ক

আইন-আদালত

আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আসামি স্বপ্না আক্তারকে দেখিয়ে কান্না জড়িত কণ্ঠে নিহত শিশু রামিসার মা পারভীন আক্তার বলেন, ‘ওরে কতবার বলি বোন দরজাটা খোল, কিন্তু সে খোলেনি’।

2026-06-02T13:18:05+00:00
2026-06-02T13:26:00+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
আদালতে আসামি স্বপ্নাকে দেখিয়ে যা বললেন রামিসার মা
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬, ১:১৮ পিএম  আপডেট: ০২.০৬.২০২৬ ১:২৬ পিএম  (ভিজিট : ১০৬)
সংগৃহীত ছবি
X

সংগৃহীত ছবি

আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আসামি স্বপ্না আক্তারকে দেখিয়ে কান্না জড়িত কণ্ঠে নিহত শিশু রামিসার মা পারভীন আক্তার বলেন, ‘ওরে কতবার বলি বোন দরজাটা খোল, কিন্তু সে খোলেনি’।

আজ মঙ্গলবার (২ জুন) ঢাকার পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার মামলায় আদালত কক্ষে এই দৃশ্যের অবতারণা হয়।

সকাল ১০টা ৩৫ মিনিট থেকে বেলা ১১টা ২৬ মিনিট পর্যন্ত ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে রামিসার বাবা ও মায়ের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। 

সাক্ষ্যগ্রহণ উপলক্ষে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আদালতে হাজির করা হয়।

​সকাল ১১টা ২ মিনিটে সাক্ষী সেলে এসে শপথ নিয়ে রামিসার মা পারভীন আক্তার আদালতের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ঘটনাটি ছিল ১৯ তারিখের। ঘটনার দিন তিনি বাসায় রান্না করছিলেন এবং রান্না প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল।

তার দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে রাইসা আক্তার তার চাচা মোস্তফার বাসায় যেতে চায়। তখন ছোট মেয়ে রামিসাও তার সঙ্গে যেতে চাইলে মা হিসেবে তিনি রামিসাকে বারণ করেন। পরে দেখেন ওরা দুজনেই রেডি হচ্ছে। একপর্যায়ে বড় মেয়ে চলে গেলেও সে রামিসাকে সঙ্গে নেয়নি।

মা তখন বুঝতে পারেননি যে রামিসাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কি না।

​পারভীন আক্তার আদালতে বলেন, এর কিছুক্ষণ পর তিনি পাশের ফ্ল্যাট থেকে একটি বাচ্চার চিৎকারের শব্দ পান। তবে ওই পাশের বাসায় কারা থাকে তা তিনি জানতেন না। 

এর ৩-৪ মিনিট পর বড় মেয়ে রাইসা বাসায় একা ফিরে আসে। মেয়েকে একা দেখে তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি একা কেন? রামিসা কোথায়?’ রাইসা জবাবে বলে, ‘রামিসা তো চাচার বাসায় যায়নি।

’ এরপর রামিসাকে না পেয়ে তিনি চারদিকে সবাইকে জিজ্ঞেস করতে থাকেন এবং লোকজনকে বলেন রামিসাকে দেখেছেন কি না। কিন্তু সবাই বলে কেউ দেখেনি। রামিসার একটি বিড়াল ছিল, তাই সে নিচে গেছে ভেবে নিচেও খোঁজ নেন। কিন্তু নিচের অফিসের লোকজনের ভেতরে খুঁজেও তাকে পাননি। 

এরপর দোতলার ব্যাচেলর বাসায় খোঁজ নেন, সেখানেও পাননি। তিন তলার ফ্ল্যাটের দরজায় ধাক্কা দিলে তারা ভেতর থেকে দরজা খোলে না। ঠিক তখনই তিনি দরজার বাইরে একটি জুতা দেখতে পান। আশপাশে অনেক  চিৎকার শুনে তার সন্দেহ হয় যে রামিসাকে হয়তো এখানেই আটকে রাখা হয়েছে।
 
​তিনি আরো জানান, ওই সময় চারতলা থেকে আসমা নামে একজন নিচে আসেন। তখন মনির নামে একজনকে নিচে পাঠিয়ে রামিসার মা লোক ডাকতে বলেন। 

লোক ডেকে আনতে বললে ১০-১২ জন লোক জড়ো হয়। এর মধ্যেই তিনি তার স্বামীকে ক্রমাগত ফোন দিতে থাকেন। এরপর অনেক ধাক্কাধাক্কি ও বাইড়াবাইড়ি করলেও ভেতর থেকে দরজা না খোলায় তারা লক ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। 

ভেতরে ঢোকা মাত্রই একজন চিৎকার করে বলে ওঠেন, ‘হায়রে কি রক্ত, রামিসার মা বলেন, আর আমার মেয়ে নেই!’ তখন রাজু নামে একজন পুরো ঘটনার ভিডিও করছিল। 

ভেতরে গিয়ে তারা দেখেন রামিসার কাটা মাথা এক জায়গায় এবং দেহ আরেক জায়গায় খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। ওই ফ্ল্যাটের ভেতরে তখন স্বপ্নাকে হাঁটাহাঁটি করতে দেখেন।

পারভীন আক্তার আদালতে বলেন, ‘তারে বলি বোন দরজাটা খোল, কিন্তু খোলেনি।’ পরে তিনি শুনতে পারেন যে রুবেল নামে একজন গ্রিল কেটে পালিয়ে গেছে। এরপর পুলিশ এসে রামিসার জামাকাপড়সহ যাবতীয় আলামত জব্দ করে।

​আদালতে আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু তাকে জব্দ তালিকায় নেওয়া স্বাক্ষরটি দেখিয়ে নিশ্চিত হতে বললে পারভীন আক্তার সেটি তার স্বাক্ষর বলে নিশ্চিত করেন। 

পরে আদালতে উপস্থিত স্বপ্না আক্তারকে দেখিয়ে শনাক্ত করতে বলা হলে পারভীন আক্তার বলেন, ‘হ্যাঁ, ওরে কত বলি বোন দরজাটা খোল, কিন্তু সে খোলেনি।’  বেলা ১১টা ২৬ মিনিটে রামিসার মায়ের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়।

এর আগে প্রথমে মামলার বাদী ও রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার সাক্ষ্য নেওয়া হয়। অসুস্থ থাকায় আদালত তাকে চেয়ারে বসে সাক্ষ্য দেওয়ার অনুমতি দেন। আদালতের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঘটনার দিন তিনি বনানী কাকলীতে তার অফিসে বসে সকাল ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে স্ত্রী পারভীন আক্তারের ফোন পান। 

খবর পেয়ে অফিস থেকে বের হয়ে বাসে করে ২৫ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে তিনি বাসায় আসেন। এসে দেখেন তার বাসার সামনে অনেক লোক জড়ো হয়ে আছে। তখন তিনি দৌড়ে বাসার সামনে যান। 

সেখানে রাজু নামে একজন এবং তার স্ত্রী পারভীন আক্তারকে দেখতে পান। তার স্ত্রী তখন জানান যে, রামিসা অপজিটের (পাশের) ফ্ল্যাটে আটকে আছে। রাজু নামের ওই ব্যক্তি তালা ভাঙার চেষ্টা করছিল এবং তার স্ত্রী অনেকক্ষণ ধরে ডাকাডাকি করছিলেন।

​সাক্ষ্যে আব্দুল হান্নান মোল্লা আরো জানান, স্ত্রীর কথা শুনে তিনি আবার নিচে দৌড়ে গিয়ে একটি হাতুড়ি নিয়ে আসেন এবং দরজার লক ভাঙার চেষ্টা করেন। হাতুড়ি এনে তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকতে তাদের আনুমানিক ২০ মিনিট সময় লাগে। তালা ভেঙে সবাই রুমের ভেতরে ঢোকেন।

ঘটনার নৃশংসতার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘কমন রুম খুলে দেখি রক্ত আর রক্ত।’ ভেতরে ঢুকে দেখেন স্বপ্না খাতুন নামের এক নারী রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন। এরপর তারা ঘরের স্টিলের খাটের নিচে রামিসার লাশ দেখতে পান। খণ্ডিত মাথা দেখে প্রথমে তিনি কিছুই বুঝতে পারেননি। 

এ সময় রামিসার মাথাটি একটি বালতির ভেতরে দেখতে পান বলে আদালতকে জানান। এরপর তিনি পুলিশকে আজকে আদালতে যা বলেছেন, তা-ই জানান। আদালতে তাকে জব্দ তালিকার স্বাক্ষর দেখাতে বলা হলে তিনি সেটি নিজের স্বাক্ষর বলে নিশ্চিত করেন।

​পরে আদালত তাকে প্রশ্ন করেন, ঘটনার দিন তার স্ত্রী ঠিক কখন ফোন দিয়েছিলেন? জবাবে তিনি বলেন, সকাল ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে তিনি মাত্র অফিসে পৌঁছান, তখনই ফোন পান। এরপর বাসযোগে আসতে আনুমানিক ১৫ মিনিট সময় লাগে। বাসায় পৌঁছে হাতুড়ি এনে তালা ভাঙতে আনুমানিক ২০ মিনিট লেগেছিল।

সেই কক্ষে কোনো জানালা ছিল কি না আদালতের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেটি তিনি দেখেননি। আদালত জানতে চান তিনি নিজের চোখে দেখেছেন কি না? 

জবাবে রামিসার বাবা বলেন, তিনি যতটুকু দেখেছেন, ঠিক ততটুকুই বলেছেন। তবে মামলার অন্যতম আসামি সোহেল রানাকে তিনি জীবনে কখনো দেখেননি বলে আদালতকে জানান। সকাল ১১টার দিকে তার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়।

রামিসার মায়ের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে মামলার ৩ নম্বর সাক্ষী ও রামিসার বড় বোন রাইসা আক্তারের অপ্রাপ্ত বয়স ও মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে তার সাক্ষ্যগ্রহণ ‘ক্যামেরায়’ (ক্লোজড ডোর) নেওয়ার আবেদন করেন আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। তাতে সায় দেন আদালত। বাকি সাক্ষীদেরও ধারাবাহিকভাবে একই আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে।

​আদালতের কার্যক্রমের শুরুতে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু আসামি সোহেল রানা কাস্টডিতে থাকা অবস্থায় বাইরে কথা বলা নিয়ে আপত্তি জানান এবং মিডিয়ার সামনে যেন সে কথা বলতে না পারে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করলে আদালত পুলিশকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বলেন।

উল্লেখ্য, গত ১ জুন দুই আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত। গত ১৯ মে দুপুরে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের ‘বি’ ব্লকের একটি ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার দিনই রামিসার বাবা ২০ মে পল্লবী থানায় মামলা করেন। মামলায় মোট ১৭ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।




  বিষয়:   আদালত  কাঠগড়া  আসামি 



Loading...
Loading...


আইন-আদালত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy