
X
সংগৃহীত ছবি
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের খবরে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে স্বস্তির সুবাতাস বইলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে মূল্যস্ফীতির পুরোনো ভয়ও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তাদের শঙ্কা, ২০১৫ সালে জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার পর যেভাবে খাদ্য, বাসাভাড়া, শিক্ষা ব্যয় ও সেবা খাতে চাপ তৈরি হয়েছিল, এবারও সেই একই সংকট নতুন করে দেখা দেবে। মূল্যস্ফীতি উসকে উঠলে বেসরকারি চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার স্বল্প আয়ের মানুষের সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পে-স্কেল সংস্কারের সঙ্গে যদি শক্তিশালী বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে এটি ‘মুদ্রাস্ফীতির চক্র’ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ বেতন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জিনিসপত্রের দামও বাড়বে। ফলে আবার নতুন করে বেতন বাড়ানোর দাবি উঠবে। এভাবেই একটি চাপযুক্ত চক্র চলতে থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে শুধু বেতন বাড়ানো নয়, বরং সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করা, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কার্যকর নজরদারি জরুরি। একই সঙ্গে খাদ্যপণ্য ও জ্বালানির মতো খাতে ভর্তুকি বা সহায়তা বাড়ানো গেলে মূল্যস্ফীতির প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব।
অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, ডলারের মূল্য ওঠানামা এবং পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে পণ্যের দাম সমন্বয় করা ছাড়া তাদের উপায় থাকে না। ফলে পে-স্কেল ঘোষণার সঙ্গে সরাসরি মূল্যবৃদ্ধিকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা ঠিক নয় বলেও মনে করেন তারা।
প্রসঙ্গত, দেশে সর্বশেষ জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। সেই পে-স্কেলের মাধ্যমে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন গড়ে ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এরপর এক দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে। এ সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয়, বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবহন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সরকারি কর্মচারীদের সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে নতুন পে-স্কেলের দাবি জানিয়ে আসছিল। অবশেষে সরকার আগামী অর্থবছর থেকে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে।
তবে এ পদক্ষেপ গ্রহণের এটি সঠিক সময় কিনা তা নিয়ে অর্থনীতিবিদরা প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের ভাষ্য, এমন এক সময়ে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যখন দেশে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের কাছাকাছি অবস্থান করছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে চাপ রয়েছে এবং রাজস্ব আহরণ কাঙ্খিত হারের অনেক পেছনে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন পে-স্কেল দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সাধারণ মূল্যস্ফীতির তুলনায় বেশি ছিল। চাল, ডাল, তেল, মাংস, মাছ, ডিম, সবজি, দুধসহ প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে বাসাভাড়া ও পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে বেতন বৃদ্ধির দাবি বাস্তবসম্মত হলেও এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে অর্থনীতিবিদরা অভিমত দিয়েছেন।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, উৎপাদনশীলতা না বাড়িয়ে কেবল বেতন বৃদ্ধি করলে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাহিদা সৃষ্টি হয়। বাজারে পণ্য সরবরাহ সেই হারে না বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, বেতন বৃদ্ধি অবশ্যই প্রয়োজন, তবে সেটি অর্থনীতির সক্ষমতা এবং রাজস্ব আহরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনও বিভিন্ন আলোচনায় উল্লেখ করেছেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লে বাজারে ভোগব্যয় বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে আবাসন, ভোগ্যপণ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবহন খাতে চাহিদা দ্রুত বাড়ে। কিন্তু সরবরাহ কাঠামো দুর্বল থাকলে সেই বাড়তি চাহিদা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারের বেতন-ভাতা বাবদ বার্ষিক ব্যয় কয়েক লাখ কোটি টাকার ঘরে পৌঁছেছে। নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে বছরে অতিরিক্ত কয়েক দশ হাজার কোটি টাকা ব্যয় বাড়তে পারে। এই অর্থের জোগান দিতে সরকারকে হয় রাজস্ব বাড়াতে হবে, নয়তো ঋণ গ্রহণ করতে হবে। উভয় ক্ষেত্রেই অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, যদি সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়, তাহলে বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়বে। এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। আবার যদি কর বাড়িয়ে রাজস্ব সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়, তাহলে উৎপাদন ব্যয় ও ব্যবসায়িক খরচ বৃদ্ধি পেতে পারে, যার প্রভাবও শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন সাবেক গভর্নর এ প্রসঙ্গে বলেন, সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় বেতন সমন্বয় প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার এবং বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ছাড়া শুধু বেতন বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়া কঠিন।
বিশ্লেষকরা ২০১৫ সালের পে-স্কেলের উদাহরণও সামনে আনছেন। ওই সময় বেতন বৃদ্ধি পাওয়ার পর রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে বাসাভাড়া, জমির দাম, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বাড়ার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। যদিও তখন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। এখন বিশ্ববাজারে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য অস্থির, ডলারের বিনিময় হার তুলনামূলক বেশি এবং আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে।
ব্যবসায়ী নেতাদের একাংশ মনে করেন, নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে বাজারে ভোক্তা ব্যয় বাড়বে, যা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে পণ্য বিক্রি বাড়বে এবং উৎপাদন খাতও উপকৃত হবে। তবে তারা সতর্ক করছেন, সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক না থাকলে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সুযোগ নিয়ে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে।
ভোক্তা অধিকারকর্মীরা বলছেন, দেশে প্রায় ১৫ থেকে ১৭ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকলেও দেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় এ সংখ্যা খুব বেশি নয়। কিন্তু বাজারে একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব তৈরি হয়। ব্যবসায়ীরা অনেক সময় বেতন বৃদ্ধির খবরকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে আগাম মূল্যবৃদ্ধি ঘটান। ফলে প্রকৃত ব্যয় না বাড়লেও অনেক পণ্যের দাম বাড়তে দেখা যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপকরা বিভিন্ন গবেষণায় দেখিয়েছেন, মূল্যস্ফীতির পেছনে শুধু চাহিদা নয়, সরবরাহ সংকট, বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব, পরিবহন ব্যয়, জ্বালানি মূল্য এবং ডলারের বিনিময় হারও বড় ভূমিকা রাখে। ফলে নতুন পে-স্কেল এককভাবে মূল্যস্ফীতির জন্য দায়ী হবে না, তবে বিদ্যমান চাপকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের আগে সরকারের উচিত কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া। প্রথমত, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, কর ফাঁকি ও কালোটাকা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানো। তৃতীয়ত, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা কমানো। চতুর্থত, সরকারি ব্যয়ের অপচয় কমিয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি করা। আর পঞ্চমত, বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে কর্মদক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করেন, নতুন পে-স্কেল প্রয়োজনীয় এবং সময়োপযোগী। কারণ গত এক দশকে জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তবে এটি যদি এমনভাবে বাস্তবায়ন করা হয় যাতে বাজারে অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি না হয়, তাহলে সরকারি কর্মচারীরা যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি সামগ্রিক অর্থনীতিও স্থিতিশীল থাকবে। অন্যদিকে পরিকল্পনা ছাড়া বড় আকারের বেতন বৃদ্ধি হলে মূল্যস্ফীতির নতুন ঢেউ সৃষ্টি হতে পারে, যার প্রভাব শুধু সরকারি চাকরিজীবী নয়, দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষকেও বহন করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, সরকারি খাতে বড় আকারে বেতন বৃদ্ধি হলে বাজারে ভোগব্যয় দ্রুত বেড়ে যায়। তবে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা সেই হারে না বাড়লে ‘ডিমান্ড-সাইড ইনফ্লেশন’ তৈরি হতে পারে। তার মতে, ‘বেতন বৃদ্ধি নিজে সমস্যা নয়, সমস্যা হয় যখন সেটি উৎপাদনশীলতা ও রাজস্ব সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না থাকে।’
অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষক ড. নাজনীন আহমেদ মনে করেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সময় মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি বিভিন্ন আলোচনায় উল্লেখ করেছেন যে, সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বৃদ্ধি পেলে নগর এলাকায় খাদ্য, আবাসন ও সেবাখাতে চাহিদা বাড়ে, যা সরবরাহ সীমিত থাকলে দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত অতীতে বিভিন্ন আলোচনায় বলেছেন, বেতন বৃদ্ধি অর্থনীতিতে ‘আয় পুনর্বণ্টন’ ঘটায়, তবে বাজারে মূল্যস্ফীতির প্রভাব নির্ভর করে ব্যবসায়িক কাঠামোর ওপর। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে অসাধু ব্যবসায়ীরা বেতন বৃদ্ধিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে দাম বাড়ায়, যা প্রকৃত অর্থনৈতিক চাপে না থাকলেও মূল্যস্ফীতি তৈরি করে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)-এর গবেষকরা সাধারণভাবে মত দেন যে, পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে স্বল্পমেয়াদে ভোগব্যয় বৃদ্ধি পায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব নির্ভর করে রাজস্ব নীতি, মুদ্রানীতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতার ওপর।
তাই নতুন পে-স্কেল এখন শুধু বেতন বৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, রাজস্বনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছে।