হাদল: গ্রামবাংলার হারিয়ে না যাওয়া সৌন্দর্য

গোলাম মাহমুদ রাব্বি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষা

ভোরের নরম আলোয় শিশিরভেজা ধানক্ষেত, সারি সারি গাছ, পাখির কলতান আর মাটির পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হবে—গ্রামবাংলার

2026-06-14T12:24:03+00:00
2026-06-14T12:24:03+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
হাদল: গ্রামবাংলার হারিয়ে না যাওয়া সৌন্দর্য
গোলাম মাহমুদ রাব্বি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশ: রোববার, ১৪ জুন, ২০২৬, ১২:২৪ পিএম   (ভিজিট : ৮৯)
ছবি: প্রতিনিধি
X

ছবি: প্রতিনিধি

ভোরের নরম আলোয় শিশিরভেজা ধানক্ষেত, সারি সারি গাছ, পাখির কলতান আর মাটির পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হবে—গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপ যেন এখানেই সবচেয়ে বেশি জীবন্ত। পাবনার ফরিদপুর উপজেলার হাদল গ্রাম এমনই এক নিভৃত জনপদ, যেখানে প্রকৃতির শান্ত সৌন্দর্য, গ্রামীণ জীবন আর মানুষের আন্তরিকতা মিলেমিশে তৈরি করেছে এক রূপকথার আবহ।


গত ৪ এপ্রিল, কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই মধ্যরাতে আমরা কয়েকজন বন্ধু রওনা দিলাম পাবনার হাদল গ্রামে, এক বন্ধুর বাড়ির উদ্দেশে। পথজুড়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে চারপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, টেরই পাইনি। ভোর ৪টা ৪০ মিনিটের দিকে পৌঁছে গেলাম হাদল গ্রামে। ঠিক তখনই ভেসে এলো ফজরের আজান। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে নামাজ আদায় করতে মসজিদে গেলাম। নামাজ শেষে শুরু হলো গ্রামটিকে কাছ থেকে দেখার যাত্রা।


হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার দুই পাশে চোখে পড়ল নানা প্রজাতির গাছ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ল আমগাছগুলো। গাছে গাছে ঝুলছে অসংখ্য কাঁচা আম। লোভ সামলাতে না পেরে পুকুরপাড়ের একটি গাছ থেকে কয়েকটি আম পেড়ে খেলাম। কিন্তু স্বাদে ছিল বেশ টক। যদিও আমের সেই টক স্বাদ মুহূর্তেই হারিয়ে গেল গ্রামের অপরূপ সৌন্দর্যের কাছে।


আরও কিছুদূর এগিয়ে দেখতে পেলাম একটি কৃষক পরিবার মাড়াই মেশিনের সাহায্যে ধান আলাদা করছে। কিছুক্ষণ তাদের কাজ দেখার পর চোখে পড়ল কয়েক দশক আগের বাংলার ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি—মহিষের গাড়ি। আধুনিকতার ছোঁয়ায় যেখানে গ্রামবাংলার অনেক পুরোনো ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে, সেখানে হাদলের মানুষ এখনো সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। মহিষের গাড়িতে ধানের আঁটি স্তূপ করে বহন করতে দেখে মনে হলো, যেন সময় কয়েক দশক পেছনে ফিরে গেছে।


আরও সামনে এগোতেই দেখা মিলল বিস্তীর্ণ বিলের বুক চিরে চলে যাওয়া একটি মাটির রাস্তা, যা চোখের শেষ সীমানা পর্যন্ত প্রসারিত। আমরা সেই পথ ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। ভোরের শীতল বাতাস মুখে এসে লাগতেই এক অনন্য অনুভূতি তৈরি হলো। শহরের ধুলাবালি আর দূষিত বাতাসের বাইরে এসে গ্রামের নির্মল, সতেজ বাতাস যেন নতুন করে প্রাণ জুড়িয়ে দিল।


সূর্যের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের মানুষও জীবিকার তাগিদে কাজে বের হতে শুরু করলেন। আমরাও গ্রামের সৌন্দর্য আরও গভীরভাবে অনুভব করতে পায়ের জুতা খুলে খালি পায়ে হাঁটতে শুরু করলাম। চারদিকে চোখে পড়ল পাটের সবুজ ক্ষেত। কোথাও আবার পেঁয়াজ রোপণের জন্য জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে।


স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এই গ্রামের অধিকাংশ কৃষক পাট, পেঁয়াজ ও রসুন চাষ করেন। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই রয়েছে একজোড়া মহিষ ও একটি মহিষের গাড়ি। কৃষিকাজের পাশাপাশি তারা গরু, ছাগল, হাঁস ও মুরগি পালন করে জীবিকার পরিধি আরও সমৃদ্ধ করেছেন।


খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে ফিরে এলাম বন্ধুর বাড়িতে। কিছুটা সতেজ হয়ে সকালের নাশতা খেতে বসলাম। খাওয়ার সময় খেয়াল করলাম, বাড়ির বেড়া ও মাচাজুড়ে ঝুলছে পেঁয়াজ ও রসুন। জানতে চাইলে তারা জানালেন, বীজ সংরক্ষণ এবং অফ-সিজনে ভালো দামে বিক্রির জন্যই এভাবে সংরক্ষণ করা হয়। গ্রামীণ মানুষের এই সহজ-সরল জীবনযাপন ও দূরদর্শিতা আমাদের মুগ্ধ করল।


দিন শেষে যখন ফেরার সময় হলো, তখন হাদলের সবুজ প্রকৃতি, শীতল বাতাস আর মানুষের আন্তরিকতা বারবার ফিরে আসার আহ্বান জানাতে লাগল। হাদল শুধু একটি গ্রাম নয়; এটি যেন বাংলার প্রকৃতি, মানুষ ও সংস্কৃতির এক নির্মল প্রতিচ্ছবি। যারা শহুরে কোলাহল থেকে কিছুটা সময়ের জন্য মুক্তি খুঁজছেন, তাদের জন্য হাদল হতে পারে এক অনন্য ভ্রমণগন্তব্য। 





Loading...
Loading...


শিক্ষা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy