
X
ছবি: প্রতিনিধি
টাঙ্গাইলের বাসাইলের লাঙ্গুলিয়া নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। ফুলকি ইউনিয়নের খাটরা গ্রামে নির্মিত জরাজীর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ ও নড়বড়ে কাঠের সাঁকোটিই এখন বাসাইল ও কালিহাতী—এই দুই উপজেলার প্রায় ২০টি গ্রামের লাখো মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা। প্রতিদিন চরম প্রাণঝুঁকি নিয়ে এই নড়বড়ে সাঁকো পার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও শত শত কোমলমতি শিক্ষার্থী। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও বছরের পর বছর ধরে জনপ্রতিনিধিদের প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি শুনলেও বাস্তবে মেলেনি একটি টেকসই সেতু।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাসাইল উপজেলার ফুলকি, খাটরা, বল্লা, কাজিপুর এবং পাশের কালিহাতী উপজেলার রামপুর, গান্ধিনা, তেজপুরসহ প্রায় ২০টি গ্রামের মানুষের উপজেলা সদরে পৌঁছানোর একমাত্র সহজ মাধ্যম এই পথটি। যাতায়াত ব্যবস্থা সচল রাখতে নিরুপায় হয়ে প্রায় ১২ বছর আগে এলাকাবাসী নিজেদের উদ্যোগে ও অর্থায়নে লাঙ্গুলিয়া নদীর ওপর এই কাঠের সাঁকোটি নির্মাণ করেন। দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় বর্তমানে সাঁকোটির কাঠ ও খুঁটি পচে গিয়ে চরম বিপজ্জনক আকার ধারণ করেছে।
সরেজমিনে এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সাঁকোটি দিয়ে পায়ে হেঁটে যাতায়াত করাও এখন দুরুহ হয়ে পড়েছে। এর ওপর দিয়েই অটোরিকশা, ভ্যান ও মোটরসাইকেলের মতো ছোট যানবাহন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। যেকোনো মুহূর্তে সাঁকোটি ভেঙে নদীতে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। এই অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যাতায়াত ব্যবস্থা নাজুক হওয়ায় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ধান, সবজি ও বিভিন্ন কাঁচামাল সময়মতো কাউলজানী বোর্ড বাজার বা উপজেলা সদরে নিতে পারছেন না। পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত খরচ ও চরম ভোগান্তির কারণে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় প্রান্তিক চাষিরা।
কাউলজানী বোর্ড বাজার এলাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, লুৎফা-শান্তা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কাউলজানী নওশেরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় এবং একাধিক ব্যাংকের শাখা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শত শত শিক্ষার্থী ও গ্রাহককে প্রতিদিন এই কাঠের সাঁকো পার হতে হয়। নড়বড়ে সাঁকো পার হতে গিয়ে অনেক সময় শিক্ষার্থীরা পা পিছলে নদীতে পড়ে বই-খাতা ভিজিয়ে ফেলছে। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কায় অভিভাবকরা সন্তানদের একা স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন।
এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়, লাঙ্গুলিয়া নদীর এই স্থানে সেতু নির্মাণকে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন জনপ্রতিনিধিরা। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত যতগুলো নির্বাচন এসেছে, প্রতিটি নির্বাচনেই বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা এই ঘাটে এসে পাকা ব্রিজ করে দেওয়ার গালভরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু ভোট শেষ হয়ে গেলে আর এলাকার মানুষের খোঁজ নেন না। ফলে খাটরা গ্রামসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি কেবল প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।
ভুক্তভোগী প্রায় ২০টি গ্রামের সাধারণ মানুষের জোর দাবি—হাজারো মানুষের জীবনের নিরাপত্তা, শিক্ষার্থীদের নির্বিঘ্ন চলাচল এবং গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে লাঙ্গুলিয়া নদীর ওপর অবিলম্বে একটি স্থায়ী ও পাকা সেতু নির্মাণ করতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা হামেদ আলী মিয়া বলেন, ‘স্বাধীনতার পর অনেক এমপি আইলো-গেল, কেউ এই ব্রিজটি কইরা দেয় না। নির্বাচন আইলে কয়, এই ব্রিজ কইরা দিমু। নির্বাচন যাওয়ার পর আর মনে থাকে না। আমাদের এই ব্রিজটি খুবই দরকার। হাজার হাজার মানুষ নড়বড়ে সাঁকো দিয়ে চলাচল কইরা থাকে।’
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক রিপন বলেন, ‘এই কাঠের সাঁকো দিয়ে চলাচল করা ঝুঁকিপূর্ণ। যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কাঠের সাঁকোটি অনেক আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। ফলে মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন স্থানে ভেঙে যায়। স্থানীয়রা টাকা তুলে এই সাঁকোটি মেরামত করে থাকে। মেরামত করতে করতে সাঁকোটি এখন আর মেরামতেরও সুযোগ নেই।’
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অপর চালক আজমত আলী বলেন, ‘ব্রিজ করে দেবে বলে অনেকেই কথা দেয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই ব্রিজটি কেউ করে দেয়নি। আমাদের কাঠের সাঁকো দিয়ে চলাচল করতে হয়। এই সাঁকোতে আমি একবার দুর্ঘটনার শিকার হই। তক্তা ভেঙে আমার গাড়ি নিচে পড়ে যায়। পরে ছয়জন মিলে টেনে ওপরে তুলি। কাঠের সাঁকো দিয়ে আমাদের প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। আমাদের এখানে ব্রিজ হওয়া অতি প্রয়োজন।’
স্থানীয় বাসিন্দা রাজু আহমেদ, কামাল হোসেন, ইসমাইল সিকদার, জয়নুদ্দিনসহ অনেকেই জানান, এই কাঠের সাঁকোটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আশপাশের প্রায় ২০ গ্রামের মানুষ এই সাঁকো দিয়ে চলাচল করে। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে থাকে। জনপ্রতিনিধিরা বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও ব্রিজটি কেউ নির্মাণ করে দেননি।
বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) কাজী ফাত্তাউর রহমান বলেন, ‘বাসাইলের খাটরা ব্রিজটি অনূর্ধ্ব ১০০ প্রকল্পের প্রথম দিকের সিরিয়ালে রাখা হয়েছে। অনূর্ধ্ব ১০০ প্রকল্প শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্রিজের টেন্ডার আহ্বান করা হবে।’
টাঙ্গাইল এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ কামরুজ্জামান জানান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান লাঙ্গুলিয়া নদীর খাটরা অংশে ব্রিজ নির্মাণের বিষয়ে তাগিদ দিয়েছেন। এই ব্রিজটি অনূর্ধ্ব ১০০ প্রকল্পের আওতায় নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া আছে। ওই প্রকল্প শুরু করতে যদি সময় লাগে, তাহলে টাঙ্গাইলের অন্য প্রকল্প থেকে ব্রিজটি নির্মাণের ব্যবস্থা করা হবে।