
X
ছবি: প্রতিনিধি
অনিয়ন্ত্রিতভাবে হবিগঞ্জ শহরে বাড়ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা। স্বাভাবিকভাবেই এসব যানের ব্যাটারি চার্জের পেছনে বেড়ে চলেছে বিদ্যুৎ ব্যয়। অন্যদিকে বারবার লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ছেন নগরবাসী। তাদের অভিযোগ, বাসাবাড়িতে যে বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা, তা টেনে নিচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক।
সরকারি হিসেবে হবিগঞ্জ শহরে ইজিবাইক রয়েছে প্রায় দেড় হাজার। তবে বাস্তবে এ সংখ্যা ছাড়িয়েছে অন্তত ৫ হাজার। অন্যদিকে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়িয়েছে বলে দাবি করেছে কয়েকটি সূত্র।
হিসাব অনুযায়ী, ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকে ১২ ভোল্টের পাঁচটি ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়। একটি ব্যাটারি চার্জ করতে প্রায় দুই ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়। পাঁচটি ব্যাটারি পূর্ণ চার্জ করতে প্রয়োজন প্রায় ১০ ইউনিট বিদ্যুৎ। আর ৫ হাজার ইজিবাইক চার্জ করতে প্রতিদিন ৫০ হাজার ইউনিট বিদ্যুতের প্রয়োজন। প্রতি ইউনিটের খরচ সর্বনিম্ন ১০ টাকা ধরলেও প্রতিদিন ৫ লাখ টাকার বিদ্যুৎ খরচ হয় এ ইজিবাইক চার্জিংয়ে। একইভাবে ৩ হাজার রিকশার চার্জে খরচ হয় আরও অন্তত ২০ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ। টাকার হিসাবে ব্যয় প্রায় ২ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চার্জ করতে প্রতিদিন প্রায় ৭ লাখ টাকার বিদ্যুৎ খরচ হয়।
ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার নজরুল ইসলাম প্রামাণিকের ভাষ্য, “ব্যাটারিচালিত এ গাড়িগুলো রাতের আঁধারে লাখো ইউনিট বিদ্যুৎ শুষে নিচ্ছে। আর এ কারণেই হবিগঞ্জজুড়ে বেড়েই চলছে বিদ্যুৎসংকট। আবাসিক মিটারের হিসাবে ব্যয় অনেক বেশি।”
অনুসন্ধানে জানা গেছে, হবিগঞ্জ শহরের শায়েস্তানগর, বগলাবাজার, গরুরবাজার, আনোয়ারপুর, কোর্ট স্টেশন, রাজনগর, উমেদনগর, চৌধুরীবাজার, যশেরআব্দা, খোয়াই নদীর উত্তরপাড়সহ আরও কয়েকটি এলাকায় শতাধিক গ্যারেজ রয়েছে এসব যানের। চার্জও করা হয় এসব গ্যারেজ থেকেই।
আনোয়ারপুর এলাকার একটি গ্যারেজের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মাসে ১০ হাজার টাকা করে দিই বিদ্যুতের লোকদের, যাতে লাইন কেটে না দেন।”
কোর্ট স্টেশন এলাকার একজন অকপটে স্বীকার করেন, “বেশি ব্যবসার জন্য রাত ১টার পর মেইন লাইনের সঙ্গে হুক দিই।”
দুটি ইজিবাইকের মালিক আবু সালেক জানান, একটি গাড়ি চার্জ করতে প্রতিদিন প্রায় ১০ ইউনিট বিদ্যুৎ লাগে। ইউনিটপ্রতি গ্যারেজমালিক ১৬ টাকা করে নেন। মাস শেষে দুটি গাড়িতে প্রায় ১০ হাজার টাকার মতো বিল আসে।
অবশ্য অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে সবসময় ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), হবিগঞ্জের উপসহকারী প্রকৌশলী সুমন কুমার প্রামাণিক জয়। তবে কী পরিমাণ বৈধ চার্জিং স্টেশন রয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে কতগুলোর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো হিসাব নেই বলেও জানান তিনি।
এ সমস্যার সমাধানের বিষয়ে পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, “হবিগঞ্জে চলাচলকারী বেশিরভাগ ব্যাটারিচালিত যানে লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহার হচ্ছে। এগুলো অনেক দামি। সরকার চাইলে এই ব্যাটারিগুলো জমা রেখে সবাইকে লিথিয়াম ব্যাটারি সরবরাহ করতে পারে। সবাই লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহার করলে সোলার চার্জিং স্টেশন চালু করা সম্ভব হবে। কারণ লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি সোলারে কার্যকরভাবে চার্জ হয় না। হবিগঞ্জ শহরের জন্য ১০ থেকে ১৫টি সোলার চার্জিং স্টেশন স্থাপন করা গেলে এ সমস্যার সমাধান হতে পারে।”
তার ভাষ্য, লিথিয়াম ব্যাটারিচালিত একেকটি ইজিবাইকের দাম পড়বে অন্তত ১০ লাখ টাকা। সে ক্ষেত্রে যে কেউ চাইলেই একটি গাড়ি কিনে সড়কে নেমে যেতে পারবে না। দক্ষ চালকরা এ পেশায় আসবেন, ফলে যাত্রী হয়রানিও কমবে।
অন্যদিকে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন হবিগঞ্জ জেলার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় ৮২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। অথচ জেলার ২৪ লাখ মানুষের ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ মাত্র (কমবেশি) ১৩০ মেগাওয়াট। আনুমানিক ২৭ মেগাওয়াট ঘাটতির কারণে জেলার সর্বত্র প্রায়ই দুই ঘণ্টা পরপর এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং করা হচ্ছে।