
X
ছবি: প্রতিনিধি
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। হবিগঞ্জ শহরের টাউন হল এলাকার ব্যস্ত সড়ক দিয়ে একের পর এক যানবাহন ছুটে যাচ্ছে। রাস্তার পাশে ছোট্ট একটি ভ্যানগাড়ি। বাহ্যিক চাকচিক্য বলতে কিছুই নেই। তবু প্রতিদিন সন্ধ্যা হলেই জমে ওঠে দোকানটি।
কেউ এক প্লেট ঝালমুড়ির জন্য থামে, কেউ মসলা মেশানো ছোলার জন্য। পথচারী, শ্রমিক, চালক—নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে দোকানটি যেন পরিচিত এক ঠিকানা।
রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে ক্রেতাদের আপ্যায়ন করছেন ৩০ বছরের আরমান মিয়া। পরিষ্কার হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হচ্ছে সন্ধ্যার নাস্তা। ছোট্ট এই দোকানই তার সংসারের ভরসা, জীবনের লড়াইয়ের মঞ্চ।
প্রথম দেখায় আরমান হোসেনকে খুব সাধারণ একজন মানুষ বলেই মনে হবে। হলুদ টি-শার্ট, পরিপাটি লুঙ্গি, মুখে দাড়ি আর মাথায় কালো চুল। কিন্তু তার মুখের হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে দীর্ঘ সংগ্রাম আর টিকে থাকার এক অদম্য গল্প।
কথা বলতে বলতে হঠাৎই তিনি ফিরে যান লাখাই উপজেলার মুড়িয়াউক গ্রামের বাড়ির গল্পে। পিতামাতা ও সাত ভাইয়ের সংসার। জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে তার কাজ করেই। এখন ঝালমুড়ি ও ছোলা বিক্রি করেন। প্রতিদিন বিকেল ৫টায় তিনি চলে আসেন এই ছোট্ট দোকান নিয়ে। রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত চলে বিক্রি।
শীতকালে ব্যবসা কিছুটা ভালো হয়। প্রতিদিন দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকার বিক্রি। কিন্তু মৌসুম বদলালে বিক্রিও কমে যায়। এখন দিনে বিক্রি হয় প্রায় এক হাজার দুইশ থেকে দেড় হাজার টাকা। সব খরচ বাদ দিয়ে হাতে থাকে চার থেকে পাঁচশ টাকা।
এই সামান্য আয় দিয়েই চলছে সংসার। তবু তার কণ্ঠে নেই কোনো অভিযোগ, নেই হতাশার সুর। মৃদু হেসে তিনি বলেন, “কষ্ট হয়, কিন্তু আল্লাহর রহমতে কোনোমতে চলে যায়।”
জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তাকে সমাজ নিয়েও ভাবায়। কথার ফাঁকে ফাঁকে উঠে আসে তার উদ্বেগ। এখন সমাজটা মাদকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তরুণরা যেভাবে মাদকাসক্ত হচ্ছে, তাতে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় লাগে। আবার মোবাইল ফোনও অনেককে খারাপ পথে নিয়ে যাচ্ছে।
তার কথায় নেই কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, নেই অর্থনীতির জটিল তত্ত্ব। তিনি একজন সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে দেখেন দেশকে, দেখেন সমাজকে।
যখন দেশের বাজেট, অর্থনীতি কিংবা উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয়, তখন তার ভাবনা খুবই সরল। “ভাই, আমরা বাজেট-টাজেট কিছু বুঝি না। গরিব মানুষ। ডাল-ভাত খেয়ে পরে কোনোমতে বেঁচে থাকতে পারলেই হলো। আমাদের কাছে বাজেট মানে বাজারের জিনিসপত্রের দাম। দাম যেন হাতের নাগালে থাকে, এটাই চাই।”
এই কথাগুলো যেন শুধু আরমানের নয়, দেশের লাখো নিম্নআয়ের মানুষের মনের ভাষা। প্রবৃদ্ধির হার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিংবা উন্নয়নের পরিসংখ্যান তাদের জীবনে খুব বেশি প্রভাব ফেলে না। তারা শুধু জানতে চায়—আজকের আয় দিয়ে আগামীকালের বাজার হবে কি না, পরিবারের জন্য দু-মুঠো খাবার জোগাড় করা যাবে কি না।
রাত বাড়তে থাকে। দোকানে ক্রেতার ভিড়ও ধীরে ধীরে কমে আসে। শেষ কয়েক প্লেট ছোলা ঝাল হচ্ছে চুলায়। রাস্তার বাতির আলো এসে পড়ে আরমানের মুখে। তাকে দেখে মনে হয়, তিনি শুধু একজন দোকানি নন। তিনি এই দেশের সংগ্রামী মানুষের প্রতিচ্ছবি।
তবে ফয়জুল হোসেনের গল্প আলাদা। কারণ এটি শুধু একজন মানুষের গল্প নয়। এটি বেঁচে থাকার গল্প, ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প, অদম্য মানুষের গল্প। আর তার সেই নীরব সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই দেশের প্রকৃত শক্তি লুকিয়ে আছে এমন অসংখ্য সাধারণ মানুষের ঘামে, ত্যাগে আর হার না মানা জীবনযুদ্ধে।