
X
আবাসন খাতে ত্রিমুখী চাপ
দীর্ঘস্থায়ী মন্দার সঙ্গে নতুন করের বোঝা, নির্মাণসামগ্রীর ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি এবং বিদ্যুতের বাড়তি খরচের ত্রিমুখী চাপে দেশের আবাসন খাত এখন গভীর সংকটের মুখোমুখি। খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, বিদ্যমান এই প্রতিকূল পরিস্থিতি যদি অব্যাহত থাকে, তবে আবাসন এবং এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ২৬৯টি সহযোগী শিল্পের প্রায় ৫০ লাখ শ্রমিকের জীবিকা ও কর্মসংস্থান বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই আবাসন বাজারে এক ধরনের স্থবিরতা নেমে আসে। এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরে আসেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান-ইসরাইল উত্তেজনার মতো বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, যা সাধারণ ক্রেতাদের ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই সংকটের মাঝেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন কর আরোপ এবং বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি আবাসন খাতের ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।
আবাসন খাতের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ঐশী প্রপার্টিজের চেয়ারম্যান মো. আইয়ূব আলী জানান, চলতি বছরে তাদের বেশ কয়েকটি প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হলেও গত পাঁচ মাসে একটি ফ্ল্যাটও বিক্রি করা সম্ভব হয়নি। স্বাভাবিক সময়ে প্রতি মাসে অন্তত কয়েকটি ইউনিট বিক্রি হলেও বর্তমানে বাজার পুরোপুরি স্থবির।
দেশের শীর্ষস্থানীয় আবাসন প্রতিষ্ঠান শেলটেকের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) মো. শাহজাহান বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাদের ফ্ল্যাট বিক্রি প্রায় ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। নতুন করের কারণে ফ্ল্যাটের দাম বৃদ্ধি পেলে নিবন্ধনের সংখ্যা আরও কমে যাবে, যা শেষ পর্যন্ত সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
নতুন প্রস্তাবিত বাজেটে আবাসন খাতের প্রধান কাঁচামাল রডের উৎপাদন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। রড তৈরির কাঁচামালের ওপর শুল্ক-কর বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতি টন রডের ভ্যাট ২ হাজার ৭০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার ৪০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) জানিয়েছে, এই কর বৃদ্ধি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ার কারণে প্রতি টন রড উৎপাদনে অতিরিক্ত ১১ থেকে ১২ হাজার টাকা ব্যয় বাড়তে পারে।
এ বিষয়ে বিএসআরএমের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত জানান, বাজেট চূড়ান্ত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে রডের নতুন দাম নির্ধারণ করা হবে। তবে এই বাড়তি ব্যয়ের চূড়ান্ত প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাকেই বহন করতে হবে। আবাসন উদ্যোক্তাদের হিসাব অনুযায়ী, সামগ্রিক নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধির ফলে ফ্ল্যাটের দাম প্রতি বর্গফুটে প্রায় ২ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
এবারের বাজেটে কেবল আবাসন নির্মাতা বা কাঁচামালই নয়, জমির মালিকদের ওপরও নতুন করের বোঝা চাপানো হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, জমি উন্নয়ন চুক্তির আওতায় সাইনিং মানির পাশাপাশি ডেভেলপারের কাছ থেকে প্রাপ্ত ফ্ল্যাট বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধার ওপর ১৫ শতাংশ ‘ক্যাপিটাল গেইন্স ট্যাক্স’ বা মূলধনি লাভ কর দিতে হবে। রিহ্যাব নেতারা হিসাব করে দেখিয়েছেন, কোনো ২৪ ইউনিটের প্রকল্পে জমির মালিক ১২টি ফ্ল্যাট পেলে এবং সেগুলোর বাজারমূল্য ১২ কোটি টাকা হলে, তাকে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা কর দিতে হবে।
আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এই নতুন করব্যবস্থা কার্যকর হলে আবাসন খাতে নতুন বিনিয়োগ কমে যাবে, প্রকল্প বাস্তবায়ন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে এবং মধ্যবিত্তের ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন পুরোপুরি নাগালের বাইরে চলে যাবে।
যেহেতু আবাসন শিল্পের সঙ্গে ইস্পাত, সিমেন্ট, সিরামিক, রং ও পরিবহনসহ ২৬৯টি শিল্প খাত জড়িত, তাই এই খাতের স্থবিরতা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।