শিবির নেতার হেনস্তার শিকার ঢাবির সাবেক ৬ শিক্ষার্থী

নিজস্ব প্রতিবেদক

শিক্ষা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল মাঠে বড় পর্দায় বিশ্বকাপ খেলা দেখতে গিয়ে হল সংসদ নেতার হেনস্তার শিকার

2026-06-28T16:16:25+00:00
2026-06-28T16:16:25+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
শিবির নেতার হেনস্তার শিকার ঢাবির সাবেক ৬ শিক্ষার্থী
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: রোববার, ২৮ জুন, ২০২৬, ৪:১৬ পিএম   (ভিজিট : ৩৪)
ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুফিয়া কামাল হলের সামনে শিক্ষার্থীরা
X

ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুফিয়া কামাল হলের সামনে শিক্ষার্থীরা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল মাঠে বড় পর্দায় বিশ্বকাপ খেলা দেখতে গিয়ে হল সংসদ নেতার হেনস্তার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন সাবেক ছয় শিক্ষার্থী।

২০১৮-১৯ সিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মুহতাসিন বিল্লাহ ইমন ফেইসবুকে লিখেছেন, শুক্রবার রাতে ফ্রান্স ও নরওয়ের খেলার দেখতে গেলে তাদের বের করে দেয়া হয়, কারণ তাদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক নারী শিক্ষার্থী ছিলেন।

যার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ, সেই সাজু মিয়া হল ছাত্র সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক; তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।


সাজু স্বীকার করেছেন যে তারা ওই সাবেক শিক্ষার্থীদের হল থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছেন। তবে ‘নারী হেনস্তার’ কথা অস্বীকার করেছেন।

তবে এ ঘটনা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। সুফিয়া কামাল হল সংসদ, ছাত্রদল এবং বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী এর প্রতিবাদ জানিয়ে দোষীদের শাস্তি দাবি করেছে।


অভিযোগকারী মুহতাসিন বিল্লাহ ইমন ‘ঢাবি ক্যাম্পাসে কি মববাজদের থেকে আমরা ঢাবিয়ানরাই নিরাপদ?’ শিরোনামে তার ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, “আমরা নিয়মানুযায়ীই হলের রেজিস্ট্রার খাতায় নাম লিখিয়ে শহীদুল্লাহ হলে প্রবেশ করি। সেখানে খেলার আগে বসেছিলাম, অনেকদিন পরে ক্যাম্পাসে আসায় আড্ডা দিচ্ছিলাম।

রাতের ঘটনার প্রতিবাদে প্রক্টরের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের শহীদুল্লাহ প্রক্টরের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের শহীদুল্লাহ হল শাখা

“হঠাৎ করে ৪ জন শিক্ষার্থী এসে আমাদের জিজ্ঞেস করে,‘ আপনারা কি ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী?’ আমরা শান্ত ভাবেই বলি, জি আমরা ১৬-১৭, ১৭-১৮ ও ১৮-১৯ সেশনের। ফ্রান্স ও নরওয়ের খেলা দেখতে আসছি।”

ইমন বলেন, “হঠাৎ করে, তাদের মধ্যে একটা ছেলে বলে, ‘আপনারা কোন লজিকে একটা মেয়ে নিয়ে বয়েজ হলে খেলা দেখতে আসছেন?’ আমরা তারপরও শান্ত ভাবে বলি, ভাইয়া আমরা তোমার ক্যাম্পাসেরই সিনিয়র, ২২ সালেও আমরা এখানে ওয়ার্ল্ডকাপ খেলা দেখতে আসছি।

“আমাদের সাথে যে শহীদুল্লাহ্ হলের ছিল, সে বলে, ‘আমাদের সাথে যে আপু উনিও ক্যাম্পাসেরই। আর তার আপন ছোট ভাই তোমাদের হলেরই ২২-২৩ সেশনের আবাসিক শিক্ষার্থী’।”

এ সময় ওই চারজনের পাশে আর আট-নয়জন এসে ঘিরে ধরে ‘চাপ প্রয়োগ করার চেষ্টা করে’ বলে অভিযোগ করেন ইমন।

তিনি বলেন, “এর মাঝেই একজন নিজেকে পরিচয় দেয় সে এই হলের সমাজসেবা সম্পাদক, পরে জানতে পারি তার নাম সাজু। তার পাশে হল সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক পরিচয় দেওয়া আরেকটা ছেলে বলা শুরু করে, ‘ভাইয়া হলের ছেলেপেলেরা যদি আপনাদের ছবি তুলে হলের গ্রুপে পোস্ট করে গালিগালাজ করে সেটা কি ভালো হবে?

“আমি তখন বলার চেষ্টা করি, কেউ আমাদের ছবি তোলার জন্য আমরা ভয় পাওয়ার কী আছে? আর সেখানে যদি কেউ আমাদেরই বিনা কারণে গালি গালাজ করে, হল সংসদের প্রতিনিধি হিসেবে তারা কোথায় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত?”

খেলা দেখতে আসার সময় সঙ্গে ‘মেয়ে’ থাকায় হুমকি দেওয়া হয়েছে অভিযোগ করে ইমন লিখেছেন, “হঠাৎ করে সাজু নামে ছেলেটা উচ্চস্বরে এবং খুবই উগ্রভাবে বলে উঠে, ‘আপনাদের আর ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করি না। আপনারা এখন ওঠেন আর বের হয়ে যান, এখানে মেয়ে নিয়ে থাকা যাবে না’।

“তখন শাওন ভাই উঠে বলে, ভাইয়া, তুমি যাকে মেয়ে মেয়ে বলছ ও আমার স্ত্রী আর তুমি কি কাইন্ডলি তোমার পরিচয় দিবা? আমরাও জানি যে কে আমাদের বের করে দিচ্ছে। তখন পাশের আরও ২-৩টা ছেলে বলাবলি শুরু করে, ভাই এই প্রোগ্রামটার অর্গানাইজার আমরা। আমাদের অনেক কিছু হ্যান্ডেল করা লাগে।”
প্রক্টরের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের শহীদুল্লাহ হল শাখা

ইমন লিখেছেন, “আমরা আমাদের সাথে হওয়া এই হ্যারাসমেন্টের বিচার চাই। বিশ্বকাপের মতো একটা উৎসবের সময়ে এভাবে ক্যাম্পাসজুড়ে হওয়া মববাজির অবসান চাই। ক্যাম্পাসের ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদেরও নিরাপদে খেলা দেখা নিশ্চিত হোক।”


যার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ, সেই সাজু মিয়া হল ছাত্র সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক। ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথে সম্পৃক্ততার কথাও স্বীকার করেছেন তিনি।

হেনস্তা করার অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করলে সাজু  গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা তাদেরকে ভালোভাবে চলে যেতে বলি। তারা উল্টো আমাদের উপর রেগে যায়। আমরা মেয়ে নিয়ে কোন কথায় বলি নাই।”

ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মিডিয়া ও প্রচার সম্পাদক মিফতাহুল মারুফও হেনস্তার অভিযোগ অস্বীকার করেন।

তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, " এখানে সিনিয়র আর জুনিয়রদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়েছে। এখানে কোনো নারী হেনস্তা হয়নি। অ্যান্টি শিবির অ্যালায়েন্স এটাকে ফ্রেমিং করে এ ঘটনা বানিয়েছে।”

এ ঘটনায় হল সংসদ কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে কিনা জানতে চাইলে জিএস তৌকির হাসান বলেন, হল সংসদে এ বিষয়ে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। তাই কোনো পদক্ষেপ নেয়নি হল সংসদ। লিখিত অভিযোগ পেলে তখন পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে কথা বলতে শহীদুল্লাহ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়াকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি  ফোন রিসিভ করেননি।

এদিকে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুফিয়া কামাল হলের একদল শিক্ষার্থী রোববার সকালে আর্জেন্টিনার ম্যাচের সময় শহীদুল্লাহ হলের খেলার মাঠে অবস্থান নেন।

সুফিয়া কামাল হল সংসদের ভিপি সানজানা চৌধুরী রাত্রী বলেন, “পরে সেখান থেকে প্রক্টরের কাছে এ ঘটনাসহ নারী হেনস্তা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্মারকলিপি দিয়েছি। একই সঙ্গে এ ঘটনায় জড়িতদের যেন বিচারের আওতায় আনা হয় সে দাবি জানিয়েছি।”

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের শহীদুল্লাহ হল শাখাও প্রক্টরের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে। সেখানে বলা হয়, “দুঃখজনকভাবে, গত ২৭ জুন ফ্রান্স বনাম নরওয়ে ম্যাচ উপভোগ করার উদ্দেশ্যে আগত কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থী ও বর্তমান শিক্ষার্থী হল ছাত্রসংসদের সমাজসেবা সম্পাদক সাজু মিয়ার দ্বারা হেনস্তার শিকার হন। এক পর্যায়ে তাদের হল প্রাঙ্গণ থেকে বের করে দেওয়া হয়, যা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশের পরিপন্থি।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের ‘ন্যক্কারজনক’ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়র দাবি জানানো হয়েছে স্মারকলিপিতে।

বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সামি আব্দুল্লাহ এবং সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম রিয়াদ এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চা, মুক্তবুদ্ধি ও গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে সংগঠিত মববাজি, মোরাল পুলিশিং, নারী শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বল প্রয়োগের প্রবণতা এবং ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের হয়রানির ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

“শহীদুল্লাহ হলের সাম্প্রতিক ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের ঘিরে ধরা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং হল ত্যাগে বাধ্য করা সেই উদ্বেগজনক প্রবণতারই বহিঃপ্রকাশ।”

অবিলম্বে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ, ক্যাম্পাসে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল শিক্ষার্থীর নিরাপদ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মব সংস্কৃতি ও হয়রানিমূলক আচরণের’ বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে প্রক্টর অধ্যাপক ইসরাফিল রতন গণমাধ্যমকে বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর একজন সহকারী প্রক্টরকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে ‘যথাযথ ব্যবস্থা’ নেওয়া হবে।






Loading...
Loading...


শিক্ষা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy