
X
ড. খন্দকার মোশাররফ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশনে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, পাঁচবারের সংসদ সদস্য, তিনবারের সাবেক মন্ত্রী ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভূ-বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বক্তব্য সংসদ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে দেওয়া তাঁর বক্তব্যে গণতন্ত্র, অর্থনীতি, জাতীয় ঐক্য, ইতিহাস ও স্থানীয় উন্নয়নের বিভিন্ন বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে।
গত ২৮ জুন রাত ৮টা ৩০ মিনিটে বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তব্যের শুরুতে তিনি মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ২০২৩ সালের নভেম্বরে গুরুতর অসুস্থতা থেকে সুস্থ হয়ে আবারও জাতীয় সংসদে বক্তব্য রাখার সুযোগ পাওয়াকে তিনি মহান আল্লাহর বিশেষ রহমত হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে দেশবাসীর দোয়া ও শুভকামনার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।
বাজেট আলোচনায় প্রবেশের আগে তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর পথচলার সুযোগ করে দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। পাশাপাশি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব, ত্যাগ ও রাজনৈতিক অবদানের প্রশংসা করেন।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব প্রসঙ্গে ড. মোশাররফ বলেন, দেশের গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরিতে সরকার ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়া ও চীন সফরের মাধ্যমে কর্মসংস্থান, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, চীনের ১১টি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে প্রায় ৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট নিয়ে তিনি বলেন, সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের গঠনমূলক আলোচনা ও সমালোচনা বাজেটকে আরও কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। সরকারের আন্তরিকতা, দক্ষ বাস্তবায়ন এবং সব রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা থাকলে এই বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক ব্যবস্থা নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরেন। একই সঙ্গে জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ থাকলে ভবিষ্যতেও বড় বড় জাতীয় লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।
নিজ জেলা কুমিল্লার উন্নয়নের দাবিও সংসদে তুলে ধরেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়ন, কুমিল্লা বিমানবন্দর চালু, ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইন নির্মাণ এবং উত্তর কুমিল্লার সাতটি উপজেলা নিয়ে পৃথক দাউদকান্দি জেলা গঠনের দাবি জানান। তাঁর মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক সেবার মান আরও বৃদ্ধি পাবে।
বক্তব্যজুড়ে সংসদীয় শালীনতা, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং সংযত রাজনৈতিক ভাষা বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল। তিনি বিরোধী মতের প্রতি সম্মান জানিয়ে জাতীয় স্বার্থে গঠনমূলক সহযোগিতার আহ্বান জানান, যা সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিবাচক চর্চা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এছাড়া অতিরিক্ত সময় দেওয়ার সুযোগ থাকলেও সংসদের কার্যপ্রণালি ও অন্যান্য সদস্যের প্রতি সম্মান জানিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বক্তব্য শেষ করেন তিনি। সংসদীয় রীতিনীতির প্রতি তাঁর এই শ্রদ্ধাবোধও আলোচনায় স্থান পেয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের এবারের বাজেট বক্তৃতা ছিল অভিজ্ঞতা, রাষ্ট্রচিন্তা এবং উন্নয়ন-দর্শনের একটি সুসংগঠিত উপস্থাপনা। জাতীয় রাজনীতির অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ যেমন সংসদে গুরুত্ব পেয়েছে, তেমনি কুমিল্লাসহ স্থানীয় উন্নয়নের দাবিগুলোও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘদিন পর জাতীয় রাজনীতির একজন প্রবীণ নেতার এমন পরিমিত, তথ্যসমৃদ্ধ ও দায়িত্বশীল বক্তব্য সংসদ এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।