চলতি বছরের প্রথম সাড়ে পাঁচ মাসে সারাদেশে ৫৯ রাজনৈতিক নেতাকর্মী খুন হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন বিএনপির ৪৫ জন এবং জামায়াতের সাতজন ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাতজন।
দলীয় কোন্দল এবং অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষ ও হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩০ জন। এর মধ্যে ২৩ জনই বিএনপি ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। জামায়াতের পাঁচজন ও আওয়ামী লীগের দুজন। বিএনপি এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কোন্দলে নিহত হয়েছেন ১৪ জন। বিএনপি ও জামায়াতের বিরোধে নিহত হয়েছেন ১১ জন। তাদের মধ্যে ছয়জন বিএনপির ও পাঁচজন জামায়াতের নেতাকর্মী। বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সহিংসতায় নিহত হয়েছেন পাঁচজন। তাদের তিনজন বিএনপির ও দুজন আওয়ামী লীগের। অন্যান্য ঘটনায় খুন হন ২৯ নেতাকর্মী।
তাদের মধ্যে ২২ জন বিএনপির, পাঁচজন আওয়ামী লীগের ও দুজন জামায়াতের। এসব খুনের ১৩টির ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, চাঁদা না দেওয়া, জমি নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক, ওয়াজ-মাহফিলের টাকার হিসাব ও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচন নিয়ে বিরোধসহ নানা কারণ। বাকি ১৬টি খুনের কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান গণমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধে সবচেয়ে বেশি ১১টি খুনের ঘটনা ঘটেছে খুলনা বিভাগে। এর পরের অবস্থানে আছে রাজশাহী, সেখানে ৮টি খুন হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা বিভাগে পাঁচ, ময়মনসিংহ বিভাগে তিন এবং চট্টগ্রাম, সিলেট ও রংপুর বিভাগে ১ জন করে খুন হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৪ জনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে, পাঁচজনকে গুলি করে এবং ১১ জনকে লাঠিসোটা দিয়ে পিটিয়ে, ইট দিয়ে মাথা থেঁতলে ও কিলঘুসি মেরে হত্যা করা হয়েছে।
আসকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ৩৪৭টি সংঘাতের ঘটনায় ৫৫ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। তবে সেই সূত্র ধরে যাচাই করতে গিয়ে ৫৩টি ঘটনার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ছাড়া একই সময়ে চট্টগ্রামের রাউজানে বিএনপিকর্মী কাউসারুজ্জামান বাবলুকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটে। আর জুনে এ পর্যন্ত খুন হয়েছেন পাঁচ রাজনৈতিক নেতাকর্মী। এর মধ্যে তিনটি ঘটনায় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত মোট ৫৯ রাজনৈতিক নেতাকর্মী খুন হয়েছেন।
আসকের তথ্য বলছে, বছরের প্রথম পাঁচ মাসে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষে আহত হন দুই হাজার ৬৩৬ নেতাকর্মী। এর মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতের সংঘর্ষে সর্বাধিক ৯৮০ জন আহত হন। এর বাইরে বিএনপি-বিএনপি সংঘর্ষে ৭৪৫, বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে ২৭০, বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষে ১২৯ ও বিএনপি-এনসিপি সংঘর্ষে ১০২ জন আহত হয়েছেন।
যেসব কারণে খুন
রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরোধে ৩০ খুনের মধ্যে সাতটিই ছিল জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে। নির্বাচনের আগে ও পরে প্রতিপক্ষের প্রার্থীর সমর্থকদের সঙ্গে সহিংসতায় এই সাতজন নিহত হন। তাদের চারজন বিএনপির ও তিনজন জামায়াতের নেতাকর্মী। নির্বাচনী বিরোধের জেরে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার হাসাদহ বাজারে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে দুজন গুরুতর আহত হন। পরে সেদিনই মারা যান জামায়াতকর্মী হাফিজুর রহমান। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ মার্চ মৃত্যু হয় স্থানীয় বাঁকা ইউনিয়ন জামায়াতের আমির মফিজুর রহমানের। জীবননগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোলায়মান শেখ জানান, সংসদ নির্বাচনের পরদিন হাসাদহ ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসানকে মারধর করে প্রতিপক্ষ। সেই ঘটনার জেরে ওই সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় মামলায় মেহেদীসহ তিনজন গ্রেপ্তার হয়।
নির্বাচনের আগেও প্রাণহানির ঘটনা রয়েছে। গত ১৬ জানুয়ারি ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় ছুরিকাঘাতে বিএনপিকর্মী নজরুল ইসলাম নিহত হন। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমরের (বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত) কর্মী ছিলেন। ঘটনার দিন এরশাদ বাজার এলাকায় তাদের একটি নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধনের পর সেখানে হামলা চালায় বিএনপি প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা। এক পর্যায়ে নজরুল ইসলামকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়।
এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধে খুন হন বিএনপির সাতজন এবং জামায়াত ও আওয়ামী লীগের একজন করে নেতাকর্মী। এর মধ্যে গত ২১ মার্চ চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় বিএনপির দুপক্ষের সংঘর্ষে শিমুল কাজী নামের এক তরুণ নিহত হন। সেদিন দুপুরে ছত্রপাড়া গ্রামে ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হান্নান ও ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি লাল খানের অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। তাতে আব্দুল হান্নানের কর্মী শিমুল খুন হন। এর আগে তার দাদা নাজিম উদ্দিন কাজী নাতিকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে অসুস্থ হয়ে মারা যান। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ছত্রপাড়া গ্রামে বিপুল পরিমাণ খাসজমি আছে, যা সব সময় সরকারি দলের নেতাকর্মীদের দখলে থাকে। সেসব জমির নিয়ন্ত্রণসহ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই দুপক্ষের সংঘর্ষ হয়।
৮ জুন রাতে রাজধানীর মৌচাকের আনারকলি মার্কেটের সামনে রমনা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক বিল্লাল হোসেনকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় যুবদলের ২১ নেতাকর্মীকে আসামি করে মামলা হয়েছে। রমনা থানার ওসি মুহাম্মদ রাহাৎ খান বলেন, পাঁচ আসামিকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ফুটপাতের চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। এর আগে ২ জুন ময়মনসিংহে রানা মিয়া নামের এক বিএনপিকর্মীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। নগরীর ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের চর ঈশ্বরদিয়া মধ্যপাড়া এলাকার গাঙের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। হত্যায় জামায়াত নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এনে মামলা হয়। কোতোয়ালি থানার ওসি মুহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম বলেন, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। এতে জড়িত সন্দেহে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন মাহমুদুল ইসলাম মাহিন (জামায়াত নেতা মফিদুল ইসলামের ছেলে), তোফাজ্জল হোসেন, তার ছেলে হূমায়ুন কবীর আকাশ ও মনিরুল ইসলাম। গত ৯ জুন রাতে বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার বারুইপাড়া ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি বাদল মোড়লকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া আহত হন বারুইপাড়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবদুল্লাহ মোড়ল। রাজনৈতিক ও আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে এ ঘটনা ঘটে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এ জন্য স্থানীয় জামায়াত নেতাদের দায়ী করছেন বিএনপির নেতারা।
বাগেরহাটের পুলিশ সুপার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার বলেন, এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে গত ১৫ জুন গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে হাসানকে ঢাকা ও মশিউরকে যশোরের অভয়নগর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদিকে ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নিয়ে বিরোধে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে গত ১০ মার্চ বিএনপির দুপক্ষের সংঘর্ষ হয়। এতে যুবদলকর্মী সজিব চৌধুরী আকাশ নিহত হন। সংঘর্ষের পর তার খোঁজ মিলছিল না। পরদিন সবজি ক্ষেত থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। সীতাকুণ্ড থানার ওসি মহিনুল ইসলাম বলেন, নির্বাচন-সংক্রান্ত বিষয়ে একটা বিরোধ ছিল। এ মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, ইউপি নির্বাচনে প্রার্থিতা নিয়ে স্থানীয় মুরাদপুর ইউনিয়ন যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহাব উদ্দিনের অনুসারীদের সঙ্গে বিএনপির কর্মী মোহাম্মদ আলিমের অনুসারীদের সংঘর্ষে নিহত হন সজিব। এ ছাড়া বিভিন্ন ঘটনায় বিএনপির নেতাকর্মী খুন হয়েছেন। যেমন সংগঠনের কমিটি গঠন ও পদ-পদবি নিয়ে মতবিরোধ থেকে সংঘর্ষে একজন, দরপত্র নিয়ে বিরোধে একজন, মসজিদের জলসায় প্রধান অতিথি করা নিয়ে সংঘাতে একজন, জলাশয় ইজারা নিয়ে সংঘর্ষে দুজন, জামায়াতের নারী কর্মীদের সভা নিয়ে তর্কাতর্কির জেরে মারধরে একজন, খাসজমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধে একজন, জামায়াত নেতার ফেসবুক পোস্টে বিরূপ মন্তব্য নিয়ে বিরোধে একজন, ধান কাটা নিয়ে বাগবিতণ্ডতার জেরে একজন ও মাটি কাটা নিয়ে বিরোধে একজন খুন হন। পাশাপাশি রাজনৈতিক কারণে পূর্বশত্রুতার জের ধরে আওয়ামী লীগের একজন এবং মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিন অপসারণ নিয়ে বিরোধে জামায়াতের একজন খুন হয়েছেন।
১৬ খুনের কারণ অজানা
রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধ ছাড়াও বিভিন্ন কারণে আরও ২৯ নেতাকর্মী খুন হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের ২২ জন রয়েছেন। তাদের ৯ জনের খুনের কারণ জানা গেছে। তিনজন আধিপত্য বিস্তারের বিরোধে, একজন ওয়াজ-মাহফিলের টাকার হিসাব নিয়ে বিরোধ, ইউপি নির্বাচন নিয়ে বিরোধে একজন, একজন পারিবারিক বিরোধ, একজন জমি নিয়ে বিরোধ, একজন ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে ও একজন চাঁদা না দেওয়ায় খুন হন।
১৩ জুন দুপুরে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার পাহাড়তলীতে দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হন যুবদল নেতা মাকসুদুল হক। তিনি রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। এ ঘটনায় আইয়ুব আলী নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। সংস্থাটি বলছে, মাসুদুল হক রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বেতাগী ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। তিনি যাতে নির্বাচন করতে না পারেন, সেজন্য হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
একই সময়ে আওয়ামী লীগ ও এর ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের পাঁচ নেতাকর্মীও অন্যান্য কারণে খুন হন। ব্যক্তিগত বিরোধে ভোলার চরফ্যাসনে যুবলীগ নেতা আবদুর রহিমকে কুপিয়ে এবং বাগেরহাটে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের জেরে শ্রমিক লীগ নেতা সোহাগ শেখকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আর নাটোরের সিংড়ায় জিয়া পরিষদের নেতা রেজাউল করিমকে গলা কেটে হত্যার ঘটনার জেরে আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে আগুন দিলে সাবিহা বেগমের মৃত্যু হয়। অপর দুটি খুনের কারণ জানা যায়নি। পৃথক ঘটনায় জামায়াত ও শিবিরের দুই নেতাকর্মী খুন হন। তাদের মধ্যে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে শিবিরের সাবেক নেতা জামাল উদ্দিনকে খুনের কারণ জানা গেছে। গার্মেন্টের ঝুট ব্যবসা নিয়ে বিরোধে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
পুলিশ সদরদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, রাজনৈতিক নেতাকর্মী খুনের মামলার তদন্তে দেখা যায়, সব সময় রাজনৈতিক কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটে না। এর একটি বড় অংশই ব্যক্তিগত বিরোধ, জমি বা অন্যান্য কারণে ঘটে। আর অল্পসংখ্যক ঘটনায় রাজনৈতিক সংঘাতের বিষয়টি প্রমাণিত হয়।