
X
ছবি: প্রতিনিধি
চাঁদপুরের মতলব উত্তর কুলাঙ্গার সন্তান আপন মাকে নির্মমভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে সন্তান । বৃহস্পতিবার(২ জুলাই) চাঁদপুরের মতলব উত্তর থানা পুলিশের একটি বিশেষ চৌকস টিম তথ্য-প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ক্ল্যুলেস এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করেছে। গ্রেফতার করা হয়েছে পাষণ্ড ছেলে মোঃ জনিকে। উদ্ধার করা হয়েছে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আলামত ও নিহতের মোবাইল ফোন।
ঘটনার বিবরণে জানা গেছে, গত ২৫ জুন ২০২৬ তারিখে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর '৯৯৯'-এর মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে মতলব উত্তর থানা পুলিশ কলাকান্দা ইউনিয়নের একটি নির্জন কলাবাগান থেকে অজ্ঞাতনামা এক নারীর গলিত ও বিকৃত লাশ উদ্ধার করে। নিহতের মাথার খুলি থেকে চুল খসে পড়েছিল এবং বাম হাত ও বাম পায়ের হাঁটুর নিচের অংশ শেয়ালে খেয়ে ফেলায় লাশটি চেনার কোনো উপায় ছিল না। তাৎক্ষণিকভাবে পিবিআই ও সিআইডি কে বিষয়টি জানানো হলেও লাশের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
হত্যাকাণ্ডটি সম্পূর্ণ ক্ল্যুলেস হওয়ায় ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন চাঁদপুরের নবাগত পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান। তাঁরই দিকনির্দেশনায় মতলব সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) জাবীর হুসনাইন সানীবের নেতৃত্বে এবং মতলব উত্তর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসানের তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়। এই টিমে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন , এসআই মিজান, এসআই রেজাউল ও এএসআই রবিউল। পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে প্রতিদিন রাতে এই তদন্তের অগ্রগতি মনিটরিং ও রিপোর্ট গ্রহণ করা হতো।
মামলার কোনো ক্লু না থাকায় পুলিশ তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তা নেয়। ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার 'লোকেশন সেল' বিশ্লেষণ এবং মাঠপর্যায়ের ম্যানুয়াল সোর্সিংয়ের মাধ্যমে তদন্তকারী দল মোঃ জনি নামের এক যুবকের ওপর সন্দেহ পোষণ করে। পরবর্তীতে তাকে গ্রেফতার করে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে বেরিয়ে আসে গা শিউরে ওঠা চাঞ্চল্যকর তথ্য।
জিজ্ঞাসাবাদে জনি জানায়, তার মা মজিদা বেগম ৩টি বিয়ে করেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই সে বাবা-মায়ের আদর-স্নেহ থেকে বঞ্চিত ছিল এবং মামাবাড়ি নিজ ছেংগারচর গ্রামে অত্যন্ত নিগৃহীত ও কষ্ট পেয়ে বড় হয়েছে। মায়ের প্রতি ছোটবেলা থেকেই তার তীব্র ক্ষোভ ও পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ছিল। জনি বর্তমানে ঢাকায় ফল বিক্রেতা হিসেবে কাজ করত।
পুলিশের কাছে জনি স্বীকার করে যে, পারিবারিক অশান্তির জেরে গত ১৭ জুন তারিখে সে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তার মা মজিদা বেগমকে ছেংগারচর বাজার থেকে একটি অটোরিকশায় তুলে কলাকান্দা ইউনিয়নের ওই নির্জন কলাবাগানে নিয়ে যায়। সেখানে কলাবাগানের ভেতরে দুই আইলের মাঝখানে জমে থাকা পানিতে মাকে জোরপূর্বক চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে সে। মৃত্যু নিশ্চিত করার পর মায়ের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি জনি দূরবর্তী একটি পুকুরে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায়।
পুলিশ জানায়, গ্রেফতারকৃত আসামি জনির দেওয়া তথ্যমতে তাকে সাথে নিয়ে অভিযান চালিয়ে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আলামত এবং পুকুর থেকে নিহতের মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে।
জানা গেছে, ঘাতক জনির পিতার নাম নজরুল ইসলাম এবং তার আসল গ্রাম পাঁচগাছিয়া হলেও সে মূলত তার নানার বাড়ি 'মুল্লকমাঝির কান্দি' গ্রামেই বসবাস করত। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রহস্য মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে উদঘাটিত হওয়ায় এলাকায় স্বস্তি নেমে এসেছে।
মতলব উত্তর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ ক্ল্যুলেস। কোনো পরিচয় ছিল না, কোনো প্রত্যক্ষদর্শীও ছিল না। তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও মাঠপর্যায়ের নিরলস তদন্তের মাধ্যমে আমরা হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছি। অপরাধী যেই হোক, আইনের আওতায় আনাই আমাদের লক্ষ্য।
মতলব সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার জাবীর হুসনাইন সানীব বলেন, এই মামলাটি আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। তদন্ত টিম দিন-রাত পরিশ্রম করেছে। প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত ও মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহের সমন্বয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। পুলিশের পেশাদারিত্ব ও সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলেই প্রকৃত আসামিকে গ্রেপ্তার করা গেছে। এ ধরনের জঘন্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।