
X
ছবি: প্রতিনিধি
সীমানাপ্রাচীর, সিসিটিভি ক্যামেরা, ফার্স্ট এইড বক্স ও নিরাপদ সড়ক পারাপারের মতো মৌলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবে ময়মনসিংহের ভালুকার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঝুঁকির মধ্যেই পাঠগ্রহণ করছে শিক্ষার্থীরা। সরকারি তথ্য ও সরেজমিন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে এমন চিত্র।
ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায় সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং কারিগরিসহ ২৮০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
প্রতিদিন এসব প্রতিষ্ঠানে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী পাঠগ্রহণে আসে। সম্প্রতি উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা যায়, অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই।
সরেজমিনে দেখা যায়, অনেক বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে নিরাপত্তাকর্মী নেই। শ্রেণিকক্ষ ও প্রবেশপথে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়নি। কোথাও অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র নেই, আবার কোথাও থাকলেও সেগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ফার্স্ট এইড বক্সও দেখা যায়নি।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কের পাশে অবস্থিত কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি নিয়ে সড়ক পারাপার করতে দেখা গেছে। অনেক স্থানে জেব্রা ক্রসিং, গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কিংবা সতর্কীকরণ সাইনবোর্ডের অভাব রয়েছে। এতে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
উপজেলা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ১৬৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ২৫টিতে সীমানাপ্রাচীর রয়েছে। ৬৩টি বিদ্যালয়ে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে। তবে সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে। অন্যদিকে অধিকাংশ মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সীমানাপ্রাচীর, সিসিটিভি ক্যামেরা, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ও ফার্স্ট এইড বক্সের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।
ভালুকা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, “প্রতিদিন সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকি। ব্যস্ত মহাসড়ক পার হতে হয়। স্কুলসংলগ্ন অংশে একটি ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ করা হলে অভিভাবকদের উদ্বেগ অনেকটাই কমে যেত।”
ভালুকা সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহা আফরোজ সাইদা বলেন, "শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশে পড়াশোনা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। বিদ্যালয়ের যেসব অবকাঠামোগত ও নিরাপত্তাজনিত ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো দ্রুত সমাধান হলে শিক্ষার্থীরা আরও স্বাচ্ছন্দ্যে পাঠদান কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবে। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করছি।"
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, “সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ চলছে। যেসব বিদ্যালয়ে নিরাপত্তা সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে, সেগুলোর তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল বলেন, “প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের বিষয়ে নিয়মিত নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। সিসিটিভি ক্যামেরা, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ও ফার্স্ট এইড বক্স নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফিরোজ হোসেন বলেন, “শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। কোথায় কী ধরনের ঘাটতি রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। শিক্ষা বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. ফখরউদ্দিন আহমেদ বলেন, “শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা আমাদের অগ্রাধিকার। উপজেলার যেসব বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় একাডেমিক ভবন, সীমানাপ্রাচীর ও শিক্ষা-সহায়ক উপকরণের প্রয়োজন রয়েছে, সেগুলোর জন্য আমি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দিয়েছি। এরই মধ্যে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও একটি দাখিল মাদ্রাসার নতুন ভবন অনুমোদন হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে এখনো নিরাপত্তা অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে, সেগুলোর জন্যও পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও অনুমোদনের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।”
শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের মতে, নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে শুধু পাঠদান নয়, নিরাপত্তা অবকাঠামো উন্নয়নেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁদের ভাষ্য, সীমানাপ্রাচীর, সিসিটিভি ক্যামেরা, সচল অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, ফার্স্ট এইড সুবিধা এবং নিরাপদ সড়ক পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।