
X
সংগৃহীত ছবি
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবির) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৩৩০ কোটি টাকার বাজেটের মধ্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৩০ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ০.০৯ শতাংশ।১৮ হাজার শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যার তুলনায় এ বরাদ্দ অত্যন্ত অপ্রতুল।
পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি পরিবেশ, আবাসন সংকট ও নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে দিন কাটে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষার্থীর। অসুস্থ হলে তাদের সবচেয়ে বড় ভরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার। তবে সীমিত জনবল, অপ্রতুল অবকাঠামো ও স্বল্প বাজেটের কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষার্থীদের কাছে মেডিকেল সেন্টারটি ‘নাপা সেন্টার’ নামেই বেশি পরিচিত।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে মেডিকেল সেন্টারের আরেক নাম ‘নাপা সেন্টার’। কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এখানকার সেবা সীমাবদ্ধ থাকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও সাধারণ কিছু ওষুধ সরবরাহে। একজন এমবিবিএস চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হলেও নেই কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আধুনিক রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা কিংবা জরুরি চিকিৎসা দেওয়ার পর্যাপ্ত সক্ষমতা। ফলে জটিল বা গুরুতর অসুস্থতায় শিক্ষার্থীদের বাধ্য হয়ে বাইরের হাসপাতাল ও ক্লিনিকের শরণাপন্ন হতে হয়।
জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষার্থী, প্রায় ৬০০ শিক্ষক এবং প্রায় ৩০০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর চিকিৎসাসেবার জন্য রয়েছে মাত্র একজন এমবিবিএস চিকিৎসক ও একটি অ্যাম্বুলেন্স। মেডিকেল সেন্টারে নেই কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, পর্যাপ্ত শয্যা, প্যাথলজি ল্যাব, ইসিজি কিংবা আধুনিক রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা। ফলে প্রাথমিক চিকিৎসার বাইরে কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মেডিকেল সেন্টারে সাধারণ জ্বর, সর্দি-কাশি বা মাথাব্যথার জন্য প্যারাসিটামল, হিস্টাসিন, মেট্রোনিডাজল, ওআরএসসহ কয়েক ধরনের প্রাথমিক ওষুধ ছাড়া তেমন কোনো চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায় না। জটিল রোগ বা জরুরি পরিস্থিতিতে রোগীদের বাইরের হাসপাতালেই যেতে হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইয়ামিন সাদাত বলেন, "জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য নামে মাত্র একটি মেডিকেল সেন্টার রয়েছে। কার্যত শিক্ষার্থীরা সেখান থেকে ন্যূনতম চিকিৎসাসেবাও পাচ্ছে না। আপনি যেকোনো রোগ নিয়ে সেখানে গেলে প্রথমেই নাম এন্ট্রি করে দুটি প্যারাসিটামল ও একটি স্যালাইন দেওয়া হয়। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, প্রতি বছর মেডিকেল সেন্টারের জন্য যে লাখ লাখ টাকার বাজেট বরাদ্দ হয়, তা কোথায় ব্যয় হয়?"
২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আদিব বলেন,"জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করলেও আবাসন সংকটের পাশাপাশি মেডিকেল সেন্টারের সীমিত জনবল ও স্বাস্থ্যসেবার কারণে তারা কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা পাচ্ছেন না। বর্তমানে মাত্র একজন চিকিৎসকের মাধ্যমে সেবা দেওয়া হচ্ছে, যা মূলত প্রাথমিক চিকিৎসাতেই সীমাবদ্ধ। প্রতি বছর স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ থাকলেও তা কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সে বিষয়ে জবাবদিহি প্রয়োজন।"
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মিতা শবনম বলেন, "মেডিকেল সেন্টারে পর্যাপ্ত সেবা দেওয়া হয় না এ অভিযোগ আমি মানি না। আমাদের যে জনবল ও ওষুধ রয়েছে, তা দিয়েই প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থীকে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করি। যারা মেডিকেল সেন্টারকে 'নাপা সেন্টার' বলেন, তারা চাইলে এখানে এসে আমাদের কার্যক্রম দেখে যেতে পারেন। তারপর মূল্যায়ন করবেন, এটি সত্যিই শুধু 'নাপা সেন্টার' কি না।"
তিনি আরও বলেন, "আমাদের এখানে জরুরি ভিত্তিতে ৪০টিরও বেশি ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হয়। তবে অনেক শিক্ষার্থীই চিকিৎসকের কাছে এসে নাপা ও স্যালাইন চেয়ে থাকেন। জ্বর হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রথম সারির ওষুধ হিসেবে প্যারাসিটামল (নাপা) দেওয়া হয়। তাই নাপা তুলনামূলক বেশি বিতরণ হয়। কিন্তু শুধু নাপা নয়, রোগের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ধরনের ওষুধই আমরা দিয়ে থাকি। প্রতিদিনই এসব ওষুধ বিতরণ হচ্ছে।"
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দিন বলেন, “আমার পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে আমি একটি কমিটি করে দিয়েছি, আমাদের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন মেডিকেলে কীভাবে সুবিধা পেতে পারে। ইতিমধ্যে তিন থেকে চারটি মেডিকেলের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। কথা চূড়ান্ত হলে আমরা একটি এমওইউতে (MoU) যাব এবং আমাদের শিক্ষার্থীরা যেন এই সুবিধাটা গ্রহণ করতে পারে। এছাড়া আরও কী ধরনের সুবিধা পেতে পারে, আমরা সেটা নিয়েও স্টাডি করছি।
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংযুক্তি এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করে মেডিকেল সেন্টারকে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে রূপান্তর করা হবে। তাদের মতে, তবেই দীর্ঘদিনের ‘নাপা সেন্টার’ পরিচয় বদলে শিক্ষার্থীদের আস্থার একটি কার্যকর চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে জবি মেডিকেল সেন্টার।