
X
ছবি : প্রতিনিধি
মাত্র ৫৩ একরের কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। আয়তনে ছোট হলেও প্রতিদিন প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর থাকে পুরো ক্যাম্পাস। ক্লাস, পরীক্ষা, সংগঠন, আড্ডা কিংবা নানা ব্যস্ততায় দিন কাটানো এসব শিক্ষার্থীর অসুস্থতার মুহূর্তে প্রথম আশ্রয়স্থল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার। কিন্তু প্রয়োজনের সময়ে এই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি কতটা ভরসা দিতে পারছে?সে প্রশ্ন অনেক দিন ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছে শিক্ষার্থীদের মনে।
ক্যাম্পাসের ভেতরে চিকিৎসাসেবার একমাত্র কেন্দ্র হলেও নানা সীমাবদ্ধতায় যেন আটকে আছে মেডিকেল সেন্টারের কার্যক্রম। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এখানে বর্তমানে মাত্র ১২ থেকে ১৩ ধরনের ওষুধ পাওয়া যায়। সাধারণ জ্বর, গ্যাস্ট্রিক বা পেটের সমস্যার জন্য প্যারাসিটামল, অ্যান্টাসিড কিংবা ওরস্যালাইনের মতো প্রাথমিক চিকিৎসা মিললেও একটু জটিল কোনো শারীরিক সমস্যা দেখা দিলেই শিক্ষার্থীদের ছুটতে হয় বাইরের বেসরকারি ক্লিনিক বা হাসপাতালে। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে পেশাদার ফার্মাসিস্টের অনুপস্থিতি।
চিকিৎসাসেবা নিতে আসা লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী ইফতেখার রাদিন বলেন, “এখানে আসার পর আমাকে শুধু সাধারণ প্যারাসিটামল ও গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ দেওয়া হয়েছে এবং বাকি ওষুধগুলো বাইরে থেকে কিনে নিতে বলা হয়েছে। এছাড়া এখানে কোনো চোখ বা দাঁতের ডাক্তার নেই। সপ্তাহে অন্তত একদিনও যদি চোখ ও দাঁতের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বসতেন, তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেক উপকার হতো।”
শুধু ওষুধের সীমাবদ্ধতাই নয়, শিক্ষার্থীদের অভিযোগের তালিকায় রয়েছে জরুরি স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ অ্যাম্বুলেন্স সেবাও। বিপদের মুহূর্তে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য যে সেবাটি সবচেয়ে বেশি নির্ভরতার হওয়ার কথা, সেটিই অনেক সময় হয়ে উঠছে অনিশ্চয়তার নাম।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, জরুরি প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্সে কল করার পর সেটি পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। কখনো কখনো দ্বিতীয়বার ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায় না। ফলে সময় নষ্ট না করে অনেক শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করেই হাসপাতালে রওনা দেন।
এদিকে বর্তমানে সচল থাকা অ্যাম্বুলেন্সটির শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও দীর্ঘদিন ধরে অচল বলে অভিযোগ রয়েছে। অসুস্থ রোগী পরিবহনের ক্ষেত্রে এটি বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে প্রচণ্ড গরমের দিনে কিংবা সংকটাপন্ন রোগী বহনের সময় এই সমস্যা আরও প্রকটভাবে অনুভূত হয় বলে জানান শিক্ষার্থীরা।
মেডিকেল সেন্টারের আরেকটি মৌলিক সংকট বিশুদ্ধ পানির অপ্রতুলতা। চিকিৎসা নিতে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত ও সহজলভ্য পানির ব্যবস্থা নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ওষুধ সেবনের মতো সাধারণ প্রয়োজন মেটাতেও অনেককে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী সুমাইয়া রিক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মেডিকেলের বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা মোটেও ভালো নয়। একেবারে প্রান্তে থাকা একটি মাত্র কল থেকে পানি এনে তারপর ওষুধ খেতে হয়। মাঝে মাঝে অনেক শিক্ষার্থী পানির ব্যবস্থাটি খুঁজেই পান না। যেখানে মেডিকেলের মতো জায়গায় বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করা উচিত ছিল সবার আগে।”
স্বাস্থ্যসেবার এই সীমাবদ্ধতাগুলোর পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বাজেট সংকটের বিষয়টি। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল বলেন, “আমাদের বাজেট সংকট রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) জানানো হয়েছে। যেহেতু চলতি বছরের বাজেট ইতোমধ্যে পাস হয়ে গেছে, তাই এই মুহূর্তে নতুন কিছু করা সম্ভব নয়। আমরা আগামী বছর বিষয়টি নিয়ে আবারও ইউজিসিকে অবগত করব। আশা করি তখন সংকটের সমাধান হবে।”
তবে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, কেবল প্রাথমিক চিকিৎসা নয় বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠুক বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টার। ওষুধের পরিধি বৃদ্ধি, নিয়মিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি, দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য অ্যাম্বুলেন্স সেবা এবং বিশুদ্ধ পানির মতো মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীদের এই ভরসাস্থল সত্যিকার অর্থেই হয়ে উঠতে পারে একটি শিক্ষার্থীবান্ধব চিকিৎসাকেন্দ্র।