
X
নূর মোহাম্মদ
দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক পদে বিপুল ভোটে জয়ী হন শিবির-সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেলের প্রার্থী নূর মোহাম্মদ। নির্বাচনের প্রায় সাত মাস পেরিয়ে গেলেও তার নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া কোনো প্রতিশ্রুতিই বাস্তবায়ন হয়নি। তবে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রশাসনিক বাধার অভিযোগ করেছেন জকসুর স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক নূর মোহাম্মদ।
গত ৫ জানুয়ারি ২০২৬ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন-২০২৫ অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের আগে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক পদে নূর মোহাম্মদের ইশতেহারে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা সুবিধা, খাদ্যের মানোন্নয়ন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, জরুরি সেবা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা সুবিধাসহ বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তবে দায়িত্ব গ্রহণের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এসব প্রতিশ্রুতির কোনোটি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।
নূর মোহাম্মদের ইশতেহারে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার আধুনিকায়ন, উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম স্থাপন, ২৪ ঘণ্টা জরুরি চিকিৎসাসেবা চালু, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ এবং তাৎক্ষণিক সাড়া প্রদান ইউনিট চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ছাত্রী হলগুলোতে মিনি মেডিকেল ইউনিট স্থাপনের কথাও উল্লেখ ছিল।
এ ছাড়া বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নারী স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োগ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিং সেশন সম্প্রসারণ, নিয়মিত মেডিকেল ক্যাম্প এবং প্রতি তিন মাসে ফ্রি ফুল বডি চেকআপের আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
স্বাস্থ্যকর খাবার ও খাদ্যমান উন্নয়নের ক্ষেত্রেও ছিল একাধিক প্রতিশ্রুতি। ক্যাম্পাস ক্যাফেটেরিয়া ও আবাসিক হলগুলোতে মানসম্মত খাবার নিশ্চিত করা, স্বল্পমূল্যে পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ, নিয়মিত খাদ্যমান পরীক্ষা এবং আর্থিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য মিল ভাউচার চালুর কথা বলা হয়েছিল।
নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল নারী কমনরুম আধুনিকায়ন, পুরুষ শিক্ষার্থীদের জন্য রেস্টরুম স্থাপন, একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনের বাইরে আধুনিক ওয়াশরুম নির্মাণ, প্রতিটি একাডেমিক ভবন ও ছাত্রী হলে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন স্থাপন, নিয়মিত কীটনাশক প্রয়োগ এবং প্রতি ১৫ দিন অন্তর ক্যাম্পাস পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি পরিচালনা।
এ ছাড়া আধুনিক ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন, অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা বৃদ্ধি, ক্যাম্পাসে মিনি জিমনেসিয়াম স্থাপন, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং শিক্ষার্থীদের জন্য স্বল্পমূল্যে স্বাস্থ্যবিমা সুবিধা চালুর প্রতিশ্রুতিও ছিল তার ইশতেহারে।
তবে নির্বাচনের প্রায় সাত মাস পেরিয়ে গেলেও এসব প্রতিশ্রুতির কোনোটি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষায়িত চিকিৎসা, খাদ্যমান উন্নয়ন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, জরুরি সেবা ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা সুবিধাসহ ইশতেহারে থাকা কোনো উদ্যোগই এখন পর্যন্ত কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও দায়িত্ব গ্রহণের পর বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে জকসুর স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক নূর মোহাম্মদ বলেন, “প্রশাসন আমাদের কাজে সহযোগিতা তো করেইনি, বরং আগ বাড়িয়ে কাজে বাধা দিয়েছে। স্বাস্থ্যবিমা সংক্রান্ত যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম গত ২ মার্চ নির্বাহী আদেশে সেটি গঠন করেছিলেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে প্রশাসনের বিভিন্ন পদে পরিবর্তন আসে। এরপর যে কাজটি আটকে রাখা হয়েছিল, সেটি আর এগোয়নি। সর্বশেষ বিষয়টি সিন্ডিকেটে পাস হওয়ার পরও আবার সেটি সিন্ডিকেটে তোলা হয়েছে। অর্থাৎ আগে থেকেই একটি বিষয় পাস হওয়ার পরও সেটি আবার সিন্ডিকেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এর চেয়েও বড় বড় বিষয় সিন্ডিকেটে পাস হচ্ছে, কিন্তু এসব বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না।”
তিনি আরও বলেন, “মে মাসে পাস হয়ে যাওয়া একটি বিষয় তারা জুলাইয়ে আবার সিন্ডিকেটে নিয়ে পাস করেছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। একটি টেবিল থেকে আরেকটি টেবিলে ফাইল যেতে পাঁচ দিন পর্যন্ত সময় নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের ইচ্ছাকৃত এই ভোগান্তির কারণেই কাজগুলো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।”
মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসক সংকটের বিষয়ে নূর মোহাম্মদ বলেন, “মেডিকেল সেন্টারে বর্তমানে মাত্র একজন চিকিৎসক রয়েছেন। আমরা বারবার প্রশাসনকে বলেছি, যেসব চিকিৎসক স্টাডি ছুটিতে আছেন, তাদের পরিবর্তে অন্তর্বর্তীকালীনভাবে কিছু চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হোক। কিন্তু প্রশাসন আমাদের এই কথাটিও শোনেনি। সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম বলেছিলেন, তিনি চিকিৎসক নিয়োগ দেবেন। কিন্তু বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন বিষয়টি আমলে নেননি।”
তিনি আরও বলেন, “চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য যে কাগজপত্র ইউজিসিতে পাঠানোর কথা, জকসুর সদস্যরা বারবার ঘুরে সেগুলো পাঠিয়েছেন। প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে আমাদের ঘোরাচ্ছে বলেই কাজগুলো বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে।”