
X
প্রতীকী ছবি
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরকারি চাকরিজীবীদের নবম জাতীয় পে স্কেল ঘোষণার পথে যাচ্ছে না সরকার। আগামী অক্টোবরে আইএমএফের সঙ্গে চলমান আলোচনার পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়টি অনেকাংশেই নির্ভর করছে আইএমএফের সম্মতির ওপর। রাজস্ব ঘাটতি ও দুর্বল আয় পরিস্থিতি বিবেচনায় সংস্থাটি পে স্কেল বাস্তবায়ন অন্তত দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছে সরকার।
রোববার (২৬ জুলাই) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে রাজস্ব আদায়, সরকারি ব্যয়, প্রস্তাবিত পে স্কেলের আর্থিক প্রভাব এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী এ প্রস্তাব আরও বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনার নির্দেশ দেন এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানির মূল্য, গ্যাস সরবরাহ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে বলেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে চূড়ান্ত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ওই আলোচনায় অনুন্নয়ন খাতের স্থায়ী ব্যয়, বিশেষ করে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে আইএমএফ যে অবস্থান নেবে, সেটিই নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, চলতি মাসে বাংলাদেশ সফরকারী আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে অর্থ বিভাগের বৈঠকে বেতন ও ভাতা বাজেটিং নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে আইএমএফ জানায়, বর্তমান রাজস্ব ভিত্তি সরকারি চাকরিজীবীদের বেতনে বড় ধরনের বৃদ্ধি বহন করার মতো শক্তিশালী নয়। পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সরকারি ব্যয় বাড়লেও রাজস্ব প্রবৃদ্ধি সে তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সীমিত আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে নতুন পে স্কেল চালু করলে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
তবে সরকার নতুন পে স্কেলের পরিকল্পনা থেকে সরে আসেনি। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন ১০ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর সুপারিশ পর্যালোচনা করে একটি সংশোধিত কাঠামো প্রস্তুত করেছে। প্রস্তাবটি অর্থ মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, আর্থিক চাপ কমাতে সরকার ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন অথবা বিকল্প পদ্ধতির বিষয়টি বিবেচনা করছে। অক্টোবরে আইএমএফের বৈঠকের আগেই এ বিষয়ে কৌশল চূড়ান্ত হতে পারে।
উল্লেখ্য, জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সুপারিশ করেছে। প্রস্তাবে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা, যাতায়াত ভাতা সংশোধন এবং অন্যান্য ভাতা পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাবও রয়েছে।
কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। এর মধ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জনপ্রশাসন খাতে অতিরিক্ত ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার বড় অংশ সম্ভাব্য নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য সংরক্ষিত।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ২০১৫ সালের পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন পুনর্নির্ধারণ না হওয়ায় মূল্যস্ফীতির চাপে তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। তবে রাজস্ব আয় বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া নতুন পে স্কেল চালু করলে সরকারের ঋণনির্ভরতা ও বাজেট ঘাটতির চাপ আরও বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তারা।