ডিবিএল গ্রুপকে ঘিরে বিভ্রান্তি, গভীর হচ্ছে রপ্তানি খাতের উদ্বেগ

জোনায়েদ মানসুর, বিশেষ প্রতিনিধি

জাতীয়

দেশের শিল্প খাতে চলমান গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট নতুন করে আলোচনায় এসেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানিমুখী শিল্পগোষ্ঠী

2026-08-03T18:30:02+00:00
2026-08-03T19:24:28+00:00
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬ ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬
   
ডিবিএল গ্রুপকে ঘিরে বিভ্রান্তি, গভীর হচ্ছে রপ্তানি খাতের উদ্বেগ
জোনায়েদ মানসুর, বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬, ৬:৩০ পিএম  আপডেট: ০৩.০৮.২০২৬ ৭:২৪ পিএম  (ভিজিট : ৪৮)
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পে অস্থিরতা
X

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পে অস্থিরতা

দেশের শিল্প খাতে চলমান গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট নতুন করে আলোচনায় এসেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানিমুখী শিল্পগোষ্ঠী ডিবিএল গ্রুপকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া একটি সংবাদকে কেন্দ্র করে। 

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির সব তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লেও পরে ডিবিএল গ্রুপ আনুষ্ঠানিকভাবে সেই তথ্য অস্বীকার করেছে। তবে এই ঘটনাকে ঘিরে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের শিল্প উৎপাদন এখন নজিরবিহীন চাপে রয়েছে। ডিবিএল গ্রুপের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তাদের সব কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে—এমন সংবাদ সঠিক নয়। 

সোমবার (৩ আগস্ট) প্রতিষ্ঠানটির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, কিছু সংবাদপোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য বিভ্রান্তিকর। এ বিষয়ে কেবল প্রতিষ্ঠানটির অফিসিয়াল যোগাযোগের ওপর নির্ভর করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এর আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছিল, গাজীপুরে অবস্থিত ডিবিএল গ্রুপের তৈরি পোশাক কারখানাগুলো দীর্ঘদিনের গ্যাসের স্বল্পচাপ ও ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারছে না। এমনকি প্রতি মাসে প্রায় ৪ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের রপ্তানি কার্যক্রমও ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিয়েও শঙ্কার কথা উঠে আসে।

প্রকাশিত সংবাদে ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এম. এ. রহিমের বরাত দিয়ে বলা হয়, কয়েক মাস ধরে চলমান গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে স্বাভাবিকভাবে কারখানা পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। পরিস্থিতি মূল্যায়নে পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও উল্লেখ করা হয়।  তবে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা জানতে ডিবিএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াহেদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল জব্বার এবং ভাইস চেয়ারম্যান এম. এ. রহিমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে, ডিবিএল গ্রুপের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান মতিন স্পিনিং মিলস পিএলসি-এর কোম্পানি সচিব মো. শাহ আলম মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, শীর্ষ কর্মকর্তারা বোর্ড সভায় ব্যস্ত থাকায় ফোন ধরতে পারেননি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ডিবিএল গ্রুপের সব পোশাক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করার খবর সঠিক নয়। তাদের অফিস স্বাভাবিকভাবেই খোলা রয়েছে এবং কেবল সরকারি ছুটির দিনগুলোতেই কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। 

একই বক্তব্য দেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মোহাম্মদ এমরোত হোসেন এফসিএ, এফসিএস। তিনি বলেন, কিছু সংবাদপোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডিবিএল গ্রুপের সব কারখানা বন্ধের যে খবর প্রচার হয়েছে, সেটি সঠিক নয়।

দেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানিকারক: ১৯৯১ সালে যাত্রা শুরু করা ডিবিএল গ্রুপ বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বহুমুখী শিল্পগোষ্ঠী। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, টেক্সটাইল প্রিন্টিং, ওয়াশিং, গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ, প্যাকেজিং, সিরামিক টাইলস, ওষুধ, ড্রেজিং, খুচরা ব্যবসা এবং ডিজিটাল রূপান্তর সেবাসহ বিভিন্ন খাতে তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত। প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন ইউনিটে ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ কর্মরত। 

গ্রুপটির একটি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান মতিন স্পিনিং মিলস পিএলসি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে নিবন্ধিত। সর্বশেষ অর্থবছরে ডিবিএল গ্রুপ প্রায় ৫২ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে ডিবিএল গ্রুপের শক্তিশালী ক্রেতা নেটওয়ার্ক রয়েছে। 

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পোশাক ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে সি অ্যান্ড এ, এইচ অ্যান্ড এম, পুমা, জর্জ, এসপ্রিট, জি-স্টার, হুগো বস এবং মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার-এর জন্য উৎপাদন করে প্রতিষ্ঠানটি। এসব বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্কের কারণে ডিবিএল গ্রুপ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানিমুখী শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।

একটি প্রতিষ্ঠানের খবর, কিন্তু সংকট পুরো শিল্পের: ডিবিএল গ্রুপ কারখানা বন্ধের খবর অস্বীকার করলেও শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ঘটনাটি দেশের জ্বালানি সংকটের প্রকৃত চিত্রকে সামনে নিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরেই তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং ও ফিনিশিং শিল্পের উদ্যোক্তারা অভিযোগ করে আসছেন, গ্যাসের স্বল্পচাপ এবং বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। 

অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কথা প্রকাশ্যে বলতে শুরু করে, তাহলে সেটি শুধু শিল্পখাত নয়, জাতীয় অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগের বিষয়। কারণ রপ্তানি, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বড় অংশই নির্ভর করছে এই খাতের ওপর।

এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটিতে সংকট আরও ঘনীভূত: শিল্পখাতের বর্তমান সংকটের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটি। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

বর্তমানে দেশের মোট চাহিদার মাত্র ৫৬ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে পেট্রোবাংলা। ফলে শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। অনেক কারখানা ডিজেল বা এলপিজি ব্যবহার করে উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও এতে উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে।

উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদন কমানোর পাশাপাশি আরও অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অংশ ইতোমধ্যে বিকল্প জ্বালানি সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে উৎপাদন স্থগিত করেছে। 

তিতাসের সরবরাহ কমেছে এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি:তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের বিতরণ এলাকায় দৈনিক প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও আগে সরবরাহ পাওয়া যেত প্রায় ১৫০ কোটি ঘনফুট। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১১৫ কোটি ঘনফুটে। এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্পাঞ্চল, সিএনজি স্টেশন এবং আবাসিক গ্রাহকদের ওপর। শিল্পাঞ্চলের বহু কারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপের অর্ধেকও পাওয়া যাচ্ছে না।

বিকেএমইএ ও বিটিএমএর উদ্বেগ: বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেছেন, গ্যাস সংকট এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগে সিএনজি স্টেশন থেকে গ্যাস এনে কিছুটা উৎপাদন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও বর্তমানে সেই সুযোগও নেই। ফলে ডাইং, ফিনিশিং এবং আয়রনিং কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে সময়মতো রপ্তানি আদেশ সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অর্ডার স্থগিত, বাতিল কিংবা মূল্য কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। 

অন্যদিকে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল জানিয়েছেন, তীব্র গ্যাস সংকটসহ বিভিন্ন কারণে বর্তমানে দেশের ১২১টি স্পিনিং মিল উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।

গাজীপুরে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি:দেশের সবচেয়ে বড় শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে গ্যাস সংকট সবচেয়ে প্রকট আকার ধারণ করেছে। কোনাবাড়ী, মৌচাক, চন্দ্রা, টঙ্গী, শ্রীপুর, কালিয়াকৈর ও বোর্ডবাজার এলাকার বহু শিল্পকারখানায় যেখানে ১০ থেকে ১৫ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন, সেখানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১ থেকে ৩ পিএসআই। অনেক সময় চাপ শূন্যের কাছাকাছি নেমে যাচ্ছে।

এ অবস্থায় অন্তত অর্ধশত ছোট ও মাঝারি কারখানা উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিল্পখাতের জন্য সতর্কবার্তা: ডিবিএল গ্রুপকে ঘিরে কারখানা বন্ধের খবর শেষ পর্যন্ত ভুল প্রমাণিত হলেও ঘটনাটি দেশের শিল্পখাতের বর্তমান বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা না গেলে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলোও উৎপাদন সংকটে পড়বে। এর প্রভাব পড়বে রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে। 

বিশ্লেষকদের মতে, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নয়; বরং পুরো শিল্পখাতের উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখা। এজন্য গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং শিল্পাঞ্চলগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি নিশ্চিত করাই হতে পারে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রধান উপায়।






Loading...
Loading...


জাতীয় এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy