
X
আলোচনা সভা
ঢাকা মহানগরীর জন্য একটি সমন্বিত ও মাল্টিমোডাল গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে আজ মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখে বেলা ১২:০০ টায় ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) সভাকক্ষে (রুম নং-৮০৫, লেভেল-৮, ডিটিসিএ ভবন) 'ঢাকা মহানগরীর মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান' বিষয়ক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় বৃহত্তর ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থার কৌশলগত দিকনির্দেশনা, চলমান প্রকল্পসমূহ এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনা করা হয় এবং একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে করণীয় বিষয়সমূহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সভায় উপস্থিত ছিলেন জনাব বিজন কান্তি সরকার, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) - হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও নৃ-গোষ্ঠী বিষয়ক; জনাব এডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, মাননীয় সংসদ সদস্য ৭২, পাবনা-৫; জনাব এ বি এম আবদুস সাত্তার, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব; জনাব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক, সচিব, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ; মোহাম্মদ আবদুর রউফ, সচিব, সেতু বিভাগ এবং নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ; জনাব মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ, পুলিশ কমিশনার, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকা। উক্ত সভায় সভাপতিত্ব করেন ডিটিসিএ-এর নির্বাহী পরিচালক (সচিব) জনাব মোহাম্মদ মসিউর রহমান। এ ছাড়াও মন্ত্রণালয়, ডিটিসিএ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ সভায় অংশগ্রহণ করেন।
উল্লেখ্য, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জ জেলা নিয়ে বিস্তৃত অধিক্ষেত্রে পরিবহন পরিকল্পনা সমন্বয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ডিটিসিএ। ১১টি মন্ত্রণালয় ও ২৭টির অধিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এ অঞ্চলের পরিবহন অবকাঠামো পরিকল্পনা, সমন্বয় ও তদারকির কাজ করে থাকে সংস্থাটি। সভায় ডিটিসিএ কর্তৃক আগামী দুই দশকের পরিবহন উন্নয়নের দিকনির্দেশক দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা 'কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (Strategic Transport Plan) ২০২৬–২০৪৫' উপস্থাপন করা হয়। এই পরিকল্পনায় ৮টি মেট্রোরেল (এমআরটি) লাইন, ২টি বিআরটি লাইন, ৩টি রিং রোড, ৮টি রেডিয়াল সড়ক, ৬টি এক্সপ্রেসওয়ে এবং ২১টি ট্রান্সপোর্টেশন হাব নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক ২০২৩ সালের ১৯.৮ কিলোমিটার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০৩০ সালে প্রায় ৭২.২ কিলোমিটার, ২০৩৫ সালে ১৩৭.৮ কিলোমিটার এবং ২০৪৫ সালে ২৬৮.৫ কিলোমিটারে উন্নীত হবে।
সভায় নগরীতে গণপরিবহনের ক্রমহ্রাসমান অংশ বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। হালনাগাদকৃত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (URSTP) অনুযায়ী, দৈনিক যাতায়াতে গণপরিবহনের অংশ ২০১৪ সালের ২২.৮ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়ে ২০২৩ সালে ৮.৯ শতাংশে নেমে এসেছে; একই সময়ে মোটরসাইকেল, থ্রি-হুইলার ও ব্যক্তিগত গাড়ির অংশ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বক্তারা মত দেন যে, নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত গণপরিবহনের মাধ্যমে এই প্রবণতা পাল্টে দেওয়াই মাল্টিমোডাল পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু।
মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের ফিডার সার্ভিস হিসেবে ডিটিসিএ মনোরেল বাস্তবায়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে। URSTP-তে মোট প্রায় ৭৯.৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ৫টি মনোরেল করিডোর প্রস্তাব করা হয়েছে। মনোরেলের প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই (PFS) সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট) নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; আগামী তিন মাসের মধ্যে অগ্রাধিকারযোগ্য করিডোর নির্ধারণ এবং ছয় মাসের মধ্যে PFS প্রতিবেদন দাখিলের কথা রয়েছে। সারা দেশ থেকে আগত যানবাহনকে নগরীর অভ্যন্তরে না ঢুকিয়ে বাইপাস করার লক্ষ্যে ডিটিসিএ ঢাকার চারদিকে ৩টি রিং রোড—প্রায় ৮৮.৮ কিলোমিটারের ইনার রিং রোড, প্রায় ১৩২.৮ কিলোমিটারের মিডল রিং রোড এবং প্রায় ১৭৮ কিলোমিটারের আউটার রিং রোড—সওজ, বিবিএ ও দুই সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তবায়নের কাজ করছে। পরিকল্পনায় সদরঘাট থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত একটি বৃত্তাকার নৌপথ এবং তার সঙ্গে সংযুক্ত একাধিক অবতরণ ঘাট (Landing Station) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা রাজধানীর নদীকেন্দ্রিক যাতায়াত পুনরুজ্জীবিত করবে।
যানজট নিরসনে সরকারের অঙ্গীকারের আলোকে মহানগরীর অভ্যন্তরের ৪টি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল—মহাখালী, গাবতলী, সায়েদাবাদ ও ফুলবাড়িয়া—পর্যায়ক্রমে নগরীর বাইরের উপযুক্ত স্থানে স্থানান্তরের কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং এ কাজে ডিটিসিএ সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডারের মধ্যে সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে ১০টি স্থান নির্ধারণ করা হয়েছিল, তন্মধ্যে ৪টি স্থানে উপরোক্ত টার্মিনালগুলো স্থানান্তরিত হচ্ছে। হেমায়েতপুর, কাঁচপুর, বাঘাইর, মদনপুর ও পূর্বাচলে অস্থায়ী ও স্থায়ী ডিপো ব্যবস্থার কার্যক্রমও সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলছে।
সভায় গণপরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ 'বাস রুট রেশনালাইজেশন (BRR)' ও কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়। বিআরটিএ অনুমোদিত ৪১৮টি রুটের মধ্যে জরিপকালে সক্রিয় পাওয়া গেছে মাত্র ৯৮টি। ডিমান্ড অ্যানালাইসিস শেষে প্রকল্পে ৩২টি প্রাথমিক রুট এবং তার পরিপূরক হিসেবে ২৫টি চক্রাকার (ফিডার) রুটের একটি যৌক্তিকীকৃত নেটওয়ার্ক প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে ঢাকায় প্রায় ৭,০০০–৭,৫০০টি বাস চলাচল করে এবং প্রতিদিন আনুমানিক ৩৭–৩৮ লক্ষ যাত্রী বাসে যাতায়াত করেন—বহু-মালিকানাধীন, খণ্ডিত ও ব্যাপকভাবে পুনরাবৃত্ত এই নেটওয়ার্ককেই কোম্পানিভিত্তিক পরিচালনার আওতায় পুনর্বিন্যাস করাই রেশনালাইজেশন কার্যক্রমের লক্ষ্য।
ডিটিসিএ 'র্যাপিড পাস (One Card for All Transport)' কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরে, যার লক্ষ্য সকল ধরনের গণপরিবহনে একটিমাত্র স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে ক্যাশলেস ও সমন্বিত ভাড়া পরিশোধ নিশ্চিত করা। বর্তমানে ১৯ লক্ষ ৩৭ হাজারের বেশি যাত্রী স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করছেন এবং শুধু মেট্রোরেলেই স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৭০ লক্ষ ট্রিপ সম্পন্ন হচ্ছে। এ পর্যন্ত কার্ডে ৬৮৫ কোটি টাকার বেশি রিচার্জ এবং প্রায় ৬৩৭.১৭ কোটি টাকা ভাড়া আদায় হয়েছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মেট্রোরেলের ৬৫.৭৩ শতাংশ যাত্রী র্যাপিড পাস/এমআরটি পাস ব্যবহার করেছেন। মেট্রোরেল ও বাসে ভাড়া আদায় কার্যক্রম ডিটিসিএ-এর ক্লিয়ারিং হাউজের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে এবং ২০২৫ সালের নভেম্বরে চালু হওয়া অনলাইন রিচার্জ সেবাও বর্তমানে চালু রয়েছে।
নগরীর বাস খাত আধুনিকীকরণ ও বায়ুর গুণগত মান উন্নয়নের লক্ষ্যে Bangladesh Clean Air Project (BCAP)–ফেজ ১: কম্পোনেন্ট ২.২ (ঢাকা বাস মডার্নাইজেশন প্রোগ্রাম-ডিবিএমপি)-এর আওতায় ঢাকা শহরে ৪০০টি ইলেকট্রিক বাস চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে ডিটিসিএ। প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের আনুমানিক মোট ব্যয় ২,৪৮,১৯৭.৫১ লক্ষ টাকা, যার মধ্যে বিশ্বব্যাংকের (IDA) ১৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ রয়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩১ সালের আগস্ট পর্যন্ত বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া এই প্রকল্পে রাজধানীতে ফ্র্যাঞ্চাইজি-ভিত্তিক ও কোম্পানি-পরিচালিত ইলেকট্রিক বাস ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে, যা পরিবহন খাত থেকে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের পাশাপাশি সেবার মান বৃদ্ধি করবে।
সভায় গাবতলী, কমলাপুর ও এয়ারপোর্টে মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা হয়, যেখানে মেট্রো, বাস, রেল, নৌ ও বিমান—একাধিক পরিবহন মাধ্যমকে সমন্বিত করে যাত্রীদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন স্থানান্তর (seamless transfer) নিশ্চিত করা হবে। বক্তারা উল্লেখ করেন, একটি আন্তঃসংযুক্ত স্মার্ট-টিকিটিং ব্যবস্থার সঙ্গে এই হাবগুলোই দৈনন্দিন বাস্তবতায় পরিকল্পনাটিকে প্রকৃত অর্থে 'মাল্টিমোডাল' রূপ দেবে।
এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে ডিটিসিএ-কে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করার গুরুত্ব সভায় গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়, যার মধ্যে রয়েছে মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্ট অথরিটি আইন, ২০২৬ প্রণয়নের উদ্যোগ এবং অধিকতর কার্যকর সমন্বয়ের স্বার্থে ডিটিসিএ-কে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সংযুক্ত করা। কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (২০২৬–২০৪৫)-এর মন্ত্রিসভা কর্তৃক অনুমোদন ও গেজেট প্রকাশ, মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্ট অথরিটি আইন, ২০২৬-এর নীতিগত অনুমোদন এবং Bangladesh Clean Air Project-এর দ্রুত অনুমোদনকে ডিটিসিএ-এর অগ্রাধিকারভুক্ত করণীয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সভায় বলা হয়, একটি বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তুলতে আধুনিক, সমন্বিত ও যাত্রীবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা অপরিহার্য এবং নির্ধারিত সময়ে মাল্টিমোডাল পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থাকে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণে যানজট নিরসন, গণপরিবহন সম্প্রসারণ ও পরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারও সভায় পুনর্ব্যক্ত করা হয়। বিশেষ অতিথিগণ উদ্যোগটিকে স্বাগত জানিয়ে যথাসময়ে বাস্তবায়নে অব্যাহত সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
সভাপতির বক্তব্যে ডিটিসিএ-এর নির্বাহী পরিচালক (সচিব) জনাব মোহাম্মদ মসিউর রহমান বিশেষ অতিথিবৃন্দসহ উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জানান এবং বৃহত্তর ঢাকার জনগণের জন্য একটি সমন্বিত, নিরাপদ ও টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা উপহার দিতে ডিটিসিএ-এর অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।