
X
ছবি : প্রতিনিধি
অতিবৃষ্টি আর নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে পানি সেচ না দেওয়ায় মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ধান উৎপাদনের প্রাণ হিসেবে পরিচিত কাউয়াদীঘি হাওর আবারও স্থায়ী জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। শত কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিকায়ন করা কাশিমপুর পাম্প হাউস। পানি দ্রুত নিষ্কাশন না হওয়ায় ডুবে যাচ্ছে আমন ধানের চারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মৎস্য খামার এবং অনাবাদি হয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে কয়েকশ হেক্টর কৃষিজমি। এতে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে শতশত কৃষকের।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ ঠিকমত পানি সেচ না দেওয়ায় চলতি মৌসুমে বোরো হারিয়েছি। এখন আশায় বুক বেধে হাওরের উপরিভাগে আমনের বীজতলা তৈরী করি।স্থায়ী জলাবদ্ধতায় বীজতলা ডুবে গেছে। এখন কি করবো আমন চাষ নিয়ে বিপাকে পড়েছি।
সরেজমিনে এলাকায় গেলে কথা হয় মৌলভীবাজার সদর উপজেলার হাওর পারের শ্যামাইজুড়ি গ্রামের ভুক্তভোগি কৃষক এস এম জামানের সাথে। তিনি বলেন,বোরো পাম্প হাউস ঠিকমত পানি সেচ না দেওয়ায় আমরা বোরো ধান ঘরে তুলতে পারিনি। এখন আশায় বুক বেধে হাওরের উপরিভাগে আমন চাষের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে আবারও ক্ষতির মুখে পড়েছি। হাওর পারের জুমাপুর গ্রামের আবু তালেব বলেন,পাম্প হাউসের সক্ষমতা বাড়াতে সম্প্রতি জার্মানি থেকে নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন ও সামনের খাল খনন করা হলেও বাস্তবে কৃষকরা এর সুফল পাচ্ছেন না। বরং পানি নিষ্কাশনে ধীরগতির কারণে জলাবদ্ধতা আরও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।
জগৎপুর গ্রামের মোস্তফা মিয়া বলেন,জলমহাল ও মাছের ঘের ইজারাদারদের সুবিধা দিতে গিয়ে সময়মতো পাম্প পরিচালনা করা হচ্ছে না যার খেসারত দিচ্ছেন কৃষকরা।
পানিউন্নয়ন র্বোড সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮২ সালে মনু নদীর তীরে ফসল রক্ষা বাঁধ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে কাউয়াদীঘি হাওরের কৃষি উৎপাদন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল বোরো মৌসুমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা এবং বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনের মাধ্যমে ফসল রক্ষা করা। কিন্তু দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতায় সেই প্রকল্পের কার্যকারিতা এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হাওরের পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আখাইলকুড়া ইউনিয়নের জগৎপুর, জুমাপুর,কান্দিগাও, শ্যামাইজুড়ি রাজনগর উপজেলার ফতেহপুর উত্তরভাগ মুন্সিবাজার পাঁচগাঁও রাজনগর ও মনসুরনগর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকার নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। নতুন রোপণ করা আমনের চারা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কয়েকশ হেক্টর জমি অনাবাদি থেকে যাওয়ার শঙ্কা করছেন কৃষকরা।উচু জমিতে লাগানো পাকাআউশ ধান তলিয়ে গেছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অসংখ্য মাছের খামার এবং পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন ১০ থেকে ১৫টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ।
জলাবদ্ধতার প্রভাব পড়েছে শিক্ষা কার্যক্রমেও। এলাকার বিভিন্ন সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অন্তত ৮ থেকে ১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং দুটি দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছে। অনেক শিক্ষার্থীকে হাঁটুপানি ও কাদা মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে আবার অনেকেই নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকতে পারছে না।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন ওয়ালীদ বলেন,বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে কাশিমপুর পাম্প হাউসের আটটি পাম্প একসঙ্গে চালানো সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে নিয়মিত ৬টি পাম্প সচল রাখা যাচ্ছে। হাওরের পাশে বহে যাওয়া কুশিয়ারা নদীর পানির পরিমাপ অনেক উপরে থাকায় হাওরের পানি কমানো যাচ্ছে না। এছাড়া ৪৪ বছরের পুরানো পাম্প এখন আগেরমত সার্ভিস দিচ্ছে না। হাওরের পানির পরিমাপ ৮.৫ এরস্থলে ৮.৬ মিলিমিটার বিরাজ করছে। বৃষ্টি থামছে না। যেকারনে পানি দ্রুত নামানো যাচ্ছে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল সিকদার বলেন,পাম্প হাউসের কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। প্রতিদিনই পানি নিষ্কাশনের কাজ চলছে। তবে বিদ্যুৎ সংকট রয়েছে।
এছাড়া কুশিয়ারা নদীর পানির স্তর উপরে থাকায় হাওরের পানি বের হতে বাধার সৃষ্টি হচ্ছে। এদিকে কৃষকদের দাবি বিদ্যুৎ সংকট ও প্রশাসনিক অজুহাতের আড়ালে আর সময় নষ্ট না করে কাশিমপুর পাম্প হাউসের সব পাম্প পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করতে হবে। অন্যথায় চলতি আমন মৌসুমেও হাজারো কৃষককে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।