মধুপুর গড়ে বিপন্ন ‘আচিক’ ভাষা রক্ষার দাবি

স্টাফ রিপোর্টার, টাঙ্গাইল

সারাবাংলা

বৈশ্বিক ভাবগাম্ভীর্যের সাথে সংগতি রেখে টাঙ্গাইলের আদিবাসী-অধ্যুষিত মধুপুর গড় অঞ্চলেও রোববার (৯ আগস্ট) নানা আয়োজনে পালন করা হবে

2026-08-08T18:04:52+00:00
2026-08-08T18:04:52+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
মধুপুর গড়ে বিপন্ন ‘আচিক’ ভাষা রক্ষার দাবি
স্টাফ রিপোর্টার, টাঙ্গাইল
প্রকাশ: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ৬:০৪ পিএম   (ভিজিট : ১৪)
মধুপুর গড়
X

মধুপুর গড়

বৈশ্বিক ভাবগাম্ভীর্যের সাথে সংগতি রেখে টাঙ্গাইলের আদিবাসী-অধ্যুষিত মধুপুর গড় অঞ্চলেও রোববার (৯ আগস্ট) নানা আয়োজনে পালন করা হবে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। 

আদিবাসীদের হাজার বছরের ঐতিহ্যগত জ্ঞান, জীবন ব্যবস্থা ও সংস্কৃতিকে সমুন্নত রাখতে জাতিসংঘ এ বছরের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান ও স্বীকৃতি: জীবন ও কল্যাণ সুরক্ষা’। দিবসটি উপলক্ষে মধুপুরের কয়েকটি আদিবাসী সংগঠনের পক্ষ থেকে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আদিবাসী দিবসের কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম স্বপন এমপি।

দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আনন্দের আবহেও মধুপুরের আদিবাসীদের মনে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় তাদের হাজার বছরের সংস্কৃতির মূল ধারক ও মাতৃভাষা ‘আচিক’ (অপযরশ) আজ নিজ ভূখণ্ডেই চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার মুখে পড়েছে। মধুপুর গড় অঞ্চলের বিভিন্ন আদিবাসী পাড়া ও গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, দিবসটি ঘিরে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ থাকলেও নতুন প্রজন্মের সিংহভাগ শিশুই তাদের নিজস্ব মাতৃভাষা বলতে পারছে না। স্থানীয় প্রবীণদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, অতীতে এ অঞ্চলের গারো আদিবাসীরা আচিক ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা জানতেন না বা ব্যবহার করতেন না। কিন্তু কালের বিবর্তনে এবং বেঁচে থাকার তাগিদে এসেছে আমূল পরিবর্তন। জীবন-জীবিকা ও উচ্চশিক্ষার জন্য বনের সন্তানরা আশপাশের বাঙালিপ্রধান এলাকায় আসতে শুরু করেছেন। 

অন্যদিকে আদিবাসী জনপদেও বাঙালিরা এসে বসতি স্থাপন করায় এক সময়ের এই বনাঞ্চলের মূল অধিবাসীরা আজ নিজ ভূমিতেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছেন। তারা জানায়, গারো শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে সম্পূর্ণ বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করতে হয়। কর্মজীবনে এসেও অফিস-আদালতসহ সব প্রাত্যহিক কাজেই তাদের বাংলা ব্যবহার করতে হয়। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগের অভাবে পরিবার ও সমাজ থেকে আচিক ভাষার চর্চা প্রায় সম্পূর্ণ হারিয়ে যাচ্ছে। 

আদিবাসী নেতাদের দেওয়া তথ্যমতে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় সোয়া লাখ গারো আদিবাসী রয়েছেন- যার মধ্যে প্রায় ২৫ হাজারের বসবাস টাঙ্গাইলের মধুপুর গড় অঞ্চলে। সম্প্রতি জলছত্র ও জয়েনশাহী সংলগ্ন পাড়াগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, স্কুলপড়ুয়া শিশুরা তাদের মাতৃভাষা ভালোভাবে বলতেই পারে না। কেউ কেউ নিজ বাড়িতে মা-বাবার মুখে শুনে এই ভাষা কিছুটা বুঝতে শিখলেও, তারা নিজেরা আচিক ভাষায় কোনো উত্তর দিতে পারে না। মা-বাবা নিজের ভাষায় ডাকলেও উত্তর আসে বাংলায়। 

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে মধুপুরের জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের নেতারা জানায়, জাতিসংঘের মূল থিম বা প্রতিপাদ্যের চেতনা তখনই সার্থক হবে যখন আদিবাসীদের ভাষা ও জীবন সুরক্ষার বাস্তব উদ্যোগ নেওয়া হবে। তারা অবিলম্বে জলছত্রসহ মধুপুর গড়ের সব সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে গারো শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়। 

মধুপুরের আদিবাসী নেতা অজয় এ মৃ জানান, আচিক ভাষার লিখিত কোনো বর্ণমালা নেই। কথিত আছে, দুর্ভিক্ষপীড়িত তিব্বত অঞ্চল ত্যাগ করে গারোরা যখন ভারতীয় উপমহাদেশে আসছিলেন, তখন যাঁর কাছে পশুর চামড়ায় লিখিত আচিক ভাষার পুঁথি-পুস্তকাদি ছিল, সেই ব্যক্তি পথে ক্ষুধার জ্বালায় সব পুঁথি-পুস্তক সেদ্ধ করে খেয়ে ফেলেন। তিনি সম্পূর্ণ ব্যাপারটি গোপন রাখেন। এ উপমহাদেশে আগমন ও বসতি স্থাপনের দীর্ঘদিন পরে ঘটনাটি প্রকাশ পায়। কিন্তু তত দিনে গারো বর্ণমালা বিস্মৃতির অতল গর্ভে হারিয়ে যায়। কারণ এ উপমহাদেশে প্রবেশের পর নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা এবং স্থায়ী বাসযোগ্য স্থান নির্বাচনের জন্য দীর্ঘদিন প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ করে অভিজ্ঞ গারোরা প্রাণ হারান। ফলে আচিক ভাষার বর্ণমালা চিরতরে হারিয়ে যায়। তবে গারোদের মুখে মুখে আচিক ভাষার প্রচলন ছিল।

এ প্রসঙ্গে ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন মধুপুর শাখার শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক ঝুমুর মৃ জানান, মাতৃভাষা ধরে রাখার জন্য তারা নিজেরা বাড়িতে সব সময় আচিক ভাষায় কথা বলেন। তবু তাদের ভাষা রক্ষা করা যাচ্ছে না। বাংলার সঙ্গে ক্রমেই মিশে যাচ্ছে।

জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদ সূত্রে জানা যায়, তাঁদের সংগঠনের পক্ষ থেকে ২০০৮ সালে গড় এলাকায় ১২টি স্কুল চালু করা হয়েছিল; যেখানে গারো শিশুদের আচিক ভাষায় শিক্ষা দেওয়া হতো। তিন বছর চলার পর দাতা সংস্থার অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় তা বন্ধ হয়ে যায়। 

আদিবাসী লেখক রাখী ম্রং জানান, ২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষা নীতিমালায় শিশুদের তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত মাতৃভাষায় শিক্ষাব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। গারো শিশুদের জন্য মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। না হলে আগামী প্রজন্ম হয়তো এ ভাষা হারিয়ে ফেলবে।





Loading...
Loading...


সারাবাংলা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy