
X
সংগৃহীত ছবি
স্ত্রী মারা যাওয়ার পর চার সন্তান—দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে একাই বড় করেছিলেন ঘনশ্যাম। জীবনের শেষ চার বছর কেটেছে ভোপালের একটি বৃদ্ধাশ্রমে।
৭০ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হলেও শেষবারের মতো তাকে দেখতে আসেনি তাঁর চার সন্তানের কেউই। শেষ পর্যন্ত পুলিশ ও বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষের সহায়তায় সম্পন্ন হয় তাঁর শেষকৃত্য।
ঘনশ্যাম ভারতের ভোপালের ইন্দোরে সাইকেলের টায়ার ও টিউব বিক্রির ছোট ব্যবসা করতেন। ছিল একটি ছোট বাড়িও। স্ত্রী মারা যাওয়ার সময় তাঁর সবচেয়ে ছোট মেয়ের বয়স ছিল মাত্র দুই বছর। সন্তানদের মানুষ করতে গিয়ে নিজের জীবনটাই উৎসর্গ করেছিলেন তিনি।
কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে সেই সন্তানদের কাছ থেকে পাননি প্রত্যাশিত ভালোবাসা ও যত্ন।
ঘনশ্যামের শেষ ঠিকানা ছিল ভোপালের ‘আপনা ঘর’ নামের একটি বৃদ্ধাশ্রম। প্রায় চার বছর সেখানে থাকার পর গত ৪ আগস্ট তাঁর মৃত্যু হয়। বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষ তাঁর পরিবারের সদস্যদের খবর দেন এবং বারবার ভোপালে এসে তাঁকে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু পরিবারের পক্ষ থেকে নানা অজুহাত দেখানো হয়।
শেষ পর্যন্ত পরিবার থেকে বৃদ্ধাশ্রমকে বলা হয়, ঘনশ্যামের শেষকৃত্য যেন তারাই করে দেন এবং পরে তাঁর মৃত্যুসনদ পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
‘আপনা ঘর’-এর পরিচালনাকারী মাধুরী মিশ্র বলেন, ঘনশ্যামের সবচেয়ে ছোট মেয়ের বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখনই তাঁর স্ত্রী মারা যান। তাঁর কথায়, “একসময় একজন বাবা চার-পাঁচটি সন্তানকে মানুষ করতে পারতেন। অথচ আজ চার সন্তান মিলে একজন বাবার দেখাশোনা করতে পারল না।”
মিশ্র জানান, ঘনশ্যামের ছোট একটি বাড়ি ছিল ইন্দোরে। পরে সেই বাড়ি বিক্রি করে অর্থ সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।
ঘনশ্যাম যে জরুরি যোগাযোগ নম্বর দিয়েছিলেন, সেটিতেও বৃদ্ধাশ্রমের পক্ষ থেকে ফোন করা হয়েছিল। কিন্তু সেখান থেকে এমন উত্তর আসে, যা আরও বিস্মিত করে কর্তৃপক্ষকে।
মিশ্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ফোনের অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, “আমি তাকে চিনি না। আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছি। তার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।” আরও বলা হয়, বাবার বাড়ির টাকা ভাই-বোনদের মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে এবং এরপর তাদের সঙ্গে ঘনশ্যামের আর কোনো সম্পর্ক নেই।
বৃদ্ধাশ্রমে আসার সময় ঘনশ্যাম আংশিকভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত ছিলেন। কথা বলতে তাঁর কষ্ট হতো এবং ঠিকমতো হাঁটতেও পারতেন না।
মিশ্র জানান, সন্তানরা তাঁকে বৃদ্ধাশ্রমে নিয়ে আসেনি। ইন্দোর থেকে বাসে ভোপালের আইএসবিটিতে আসার পর কয়েকজন তরুণ সমাজকর্মী তাঁকে সেখানে দেখতে পান। পরে তাঁরাই ঘনশ্যামকে ‘আপনা ঘর’-এ নিয়ে আসেন।
যে মানুষটি একসময় নিজের চার সন্তানকে হাঁটতে শেখাতে হাত ধরে পাশে ছিলেন, জীবনের শেষ বয়সে সেই মানুষটিই আংশিক পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় একটি বাস টার্মিনালে প্রায় একা পড়ে ছিলেন।
পরবর্তী চার বছর বৃদ্ধাশ্রমই হয়ে ওঠে তাঁর বাড়ি। অসুস্থ হলে কর্তৃপক্ষ তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যেত এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করত। কিন্তু সন্তানদের কেউই তাঁকে দেখতে আসেননি।
৪ আগস্ট ঘনশ্যামের মৃত্যু হয়।
বৃদ্ধাশ্রমে দীর্ঘদিন মরদেহ সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় কর্তৃপক্ষ পরিবারের অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরও ইন্দোরের পঞ্চবটি এলাকার ঠিকানায় যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু কাউকে পাওয়া যায়নি।
শেষ পর্যন্ত পুলিশের সহায়তায় ঘনশ্যামের শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।
মিশ্র জানান, সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়েও পরিবারের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। তাঁর দাবি, এক মেয়ে অভিযোগ করেছিলেন যে বাবা সম্পত্তি ছেলেদের দিয়ে দিয়েছেন এবং তিনি কিছুই পাননি। তাই তাঁর প্রশ্ন ছিল, “আমি কেন যাব?” অন্যদিকে ছেলেদের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছিল, “তিনি আমাদের জন্য কী করেছেন?”
ঘনশ্যামের শেষকৃত্য শেষ হয়েছে। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পরও শেষ হয়নি ঘটনাটি।
এখন তাঁর পরিবার মৃত্যুসনদ চাইছে।
তবে মাধুরী মিশ্র জানিয়েছেন, তিনি ঘনশ্যামের মৃত্যুসনদ পরিবারের হাতে তুলে দিতে চান না।
তাঁর প্রশ্ন, “তিনি জীবিত থাকাকালে দেখতে আসেননি, মৃত্যুর পরও এলেন না—তাহলে এখন কেন তাঁর মৃত্যুসনদ নিতে আসছেন?”
ঘনশ্যামের জীবনের এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়; এটি বয়স্ক বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সম্পত্তির সঙ্গে মানবিকতার সম্পর্ক নিয়েও গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি