
X
সংগৃহীত ছবি
ইন্দোনেশিয়ায় আজ পরপর বেশ কয়েকবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর মধ্যে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। এ ঘটনায় দেশটিতে প্রায় ৩৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে—ইন্দোনেশিয়ায় বছরে কতবার ভূমিকম্প হয় এবং এসব ভূমিকম্পে কত মানুষের মৃত্যু হয়?
দেশটির জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ভূতাত্ত্বিক সংস্থার মতে, ইন্দোনেশিয়ায় উচ্চ ভূমিকম্পপ্রবণতার প্রধান কারণ হলো চারটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের পারস্পরিক ক্রিয়া। দেশটির ভূমিকম্পের উৎস সমুদ্রের গভীরে এবং স্থলভাগ—দুই জায়গাতেই রয়েছে।
দেশটির প্রধান ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলগুলো সাবডাকশন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ প্রক্রিয়ায় একটি মহাসাগরীয় প্লেট আরেকটি প্লেটের নিচে প্রবেশ করে। এসব সাবডাকশন অঞ্চল পশ্চিম সুমাত্রা থেকে শুরু হয়ে জাভা ও নুসা তেঙ্গারার দক্ষিণ উপকূল বরাবর বিস্তৃত এবং পরে মালুকু দ্বীপপুঞ্জের দিকে বাঁক নিয়েছে। একই ধরনের টেকটোনিক প্রক্রিয়া সুলাওয়েসি ও পাপুয়ার উত্তরাঞ্চলেও দেখা যায়।
পূর্ব উত্তর সুলাওয়েসি থেকে হালমাহেরা দ্বীপের পশ্চিমাংশ পর্যন্ত ভূতাত্ত্বিক সংস্থা একটি বিরল দ্বৈত সাবডাকশন ব্যবস্থা শনাক্ত করেছে। এটি ‘ডাবল সাবডাকশন’ নামে পরিচিত, যেখানে দুটি প্লেট একে অপরের নিচে প্রবেশ করে।
ইন্দোনেশিয়ার সাবডাকশন অঞ্চলগুলোকে গভীরতার ভিত্তিতেও শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। ৪০ কিলোমিটারের কম গভীরতার অগভীর সাবডাকশন এলাকাগুলোকে মেগাথ্রাস্ট জোন বলা হয়। এসব অঞ্চল থেকে বড় ও ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প এবং সুনামির সৃষ্টি হতে পারে। অন্যদিকে, ৪০ কিলোমিটারের বেশি গভীরতার সাবডাকশন অঞ্চলগুলোকে ইন্ট্রাস্ল্যাব জোন বলা হয়।
২০২৬ সালে প্রবেশের পর ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূ-পদার্থবিদ্যা সংস্থা (বিএমকেজি) জানিয়েছে, টেকটোনিক শক্তি জমা হতে পারে—এমন অঞ্চলগুলোতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ সক্রিয় ফল্ট লাইনের কাছাকাছি বসবাসকারী জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে শুধু ভূমিকম্পের মাত্রা নয়, সম্ভাব্য ভূমি কম্পন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিপদের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিএমকেজির ভূমিকম্প ও সুনামি বিভাগের পরিচালক দারিয়োনো বলেন, ‘উচ্চমাত্রার ভূকম্পন কার্যকলাপকে প্রস্তুতি ক্রমাগত উন্নত করার জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।’ তিনি ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে জনসচেতনতা ও দুর্যোগ প্রশমন কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
২০২৫ সালে ৪৩ হাজারের বেশি ভূমিকম্প
বিএমকেজির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালজুড়ে ইন্দোনেশিয়ায় উচ্চমাত্রার ভূকম্পন কার্যকলাপ দেখা গেছে। ওই বছর দেশটিতে ৪৩ হাজারেরও বেশি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়।
বিএমকেজির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশজুড়ে মোট ৪৩ হাজার ৪৩৯টি ভূমিকম্প হয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই ছিল স্বল্পমাত্রার। বিশ্বের অন্যতম সক্রিয় টেকটোনিক সীমানার কাছে ইন্দোনেশিয়ার অবস্থানের কারণেই দেশটিতে এত ঘন ঘন ভূমিকম্প হয়ে থাকে।
দারিয়োনো জানান, মোট ভূমিকম্পের মধ্যে ৪৩ হাজার ২৮৬টির মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ০-এর নিচে। আর ১৫৩টি ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ০ বা তার বেশি, যেগুলোকে মাঝারি থেকে শক্তিশালী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।
তিনি এই ভূমিকম্পের প্রবণতাকে দুর্যোগ প্রশমন ও প্রস্তুতি জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার একটি অনুস্মারক হিসেবে উল্লেখ করেন।
২০২৫ সালের অন্যতম প্রাণঘাতী ভূমিকম্প ছিল ১৭ আগস্ট মধ্য সুলাওয়েসির পোসোতে আঘাত হানা ৫ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্প। ওই ঘটনায় দুজন নিহত হন।
অধিকাংশ ভূমিকম্প অনুভূত হয় না
বিএমকেজি জানিয়েছে, ২০২৫ সালে সারা দেশে মাত্র ৯৭৩টি ভূমিকম্প মানুষ অনুভব করতে পেরেছিল। এর মধ্যে ২৫টি ভূমিকম্প ছিল বিধ্বংসী, যাতে বাড়িঘর ও সরকারি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়।
বাকি ভূমিকম্পগুলোর অনেকগুলোর উৎপত্তিস্থল ছিল উপকূল থেকে দূরে। আবার কিছু ভূমিকম্প এত গভীরে সংঘটিত হয়েছে যে, ভূপৃষ্ঠে এর প্রভাব ছিল সীমিত।
অর্থাৎ, ইন্দোনেশিয়ায় বছরে কয়েক দশক হাজার ভূমিকম্প হলেও এর অধিকাংশই মানুষের অনুভূতির সীমার বাইরে থাকে। তবে অল্পসংখ্যক শক্তিশালী ভূমিকম্পই বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির কারণ হতে পারে। এ কারণে দেশটিতে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি দুর্যোগ প্রস্তুতি ও জনসচেতনতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।