
X
আটাকামা মরুভূমি স্পেনীয় ভাষায় Desierto de Atacama দেসিয়ের্তো দে আতাকামা উত্তর চিলিতে অবস্থিত একটি শীতল,শুষ্ক, বৃষ্টিবিহীন মরুভূমি অঞ্চল। আবহাওয়াবিদদের মতে ১৫৭০ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এই ৪০০ বছরে এখানে কোন বৃস্টি হয়নি। তাদের মতে এখানে প্রতি ১০০ বছরে গড়ে ৩ থেকে ৪ বার বৃষ্টিপাত হয়। তবে মরুভূমির মধ্যে এমন কিছু জায়গা রয়েছে, যেখানে কখনো বৃষ্টিপাত হয় না। এটি পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর উপকূলস্থিত পর্বতমালা কর্দিলেরা দে লা কোস্তা এবং পূর্বে আন্দেস পর্বতমালা দ্বারা আবদ্ধ,উত্তরে মরুভূমিটি তারাপাকা অঞ্চল হয়ে পেরু সীমান্ত পর্যন্ত চলে গেছে।
এই পর্বতমালা মরুভূমির দু’পাশ হতে আসা বায়ুপ্রবাহ এবং তার মেঘ আটকে রাখে। ফলে এখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। মরুভূমিটি উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং এটির আয়তন প্রায় ৩,৬৩,০০০ বর্গকিলোমিটার। উত্তর প্রবাহিত হামবোল্ট মহাসাগরের স্রোত এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অ্যান্টিসাইক্লোনের উপস্থিতির কারণে মরুভূমিটি অত্যন্ত শুষ্ক অঞ্চল হয়ে উঠেছে। মরুভূমির এই শুষ্ক অঞ্চলটি প্রশান্ত মহাসাগর বা আটলান্টিক মহাসাগর থেকে আর্দ্রতা রোধ করতে বেশ উচ্চতাসম্পন্ন দুটি পর্বতমালা আন্দিজ এবং চিলির উপকূল রেঞ্জের ম্ধ্যে অবস্থিত।
নাসার দ্বারা পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, যে উত্তর চিলিতে অবস্থিত এই মরুভূমিটি আসলে বিশ্বের সবচেয়ে শুষ্কতম মরুভূমি। আন্ডেস পর্বতমালা এবং চিলিয়ান কোস্টাল রেঞ্জ উভয়ই এই মরুভূমির চারপাশে আর্দ্রতা সৃষ্টি করে,এটি আটকামা মরুভূমি উদ্ভিদের জন্য একটি মৃত্যুর অঞ্চল তৈরি করে, যা পানি এবং পুষ্টি থেকে জমিকে বঞ্চিত করে। তাপীয় বিপরীতায়নের কারণেই আটাকামাতে বৃষ্টিপাত কম হয়। অ্যান্টার্কটিক অঞ্চল থেকে হামবোল্ট সমুদ্রস্রোত যে শীতল পানি বয়ে নিয়ে আসে,তা সমুদ্রপৃষ্ঠের উপরিভাগের বায়ুকে শীতল করে,এবং গরম বায়ু উপরে উঠে যায়। এই উষ্ণ বায়ু আটাকামা মরুভূমিতে কুয়াশার ও স্ট্র্যাটাস মেঘের সৃষ্টি করে,কিন্তু বৃষ্টিপাত হয় না বললেই চলে। বিপরীতায়নের ফলে বিষুবরেখার কাছে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও আটাকামা মরুভূমির তাপমাত্রা সারা পৃথিবীর অন্যান্য মরুভূমিতে যেমন সাহারার তাপমাত্রা ১৩০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ছাড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু আটকামার তাপমাত্রা সারা বছর তুলনামূলকভাবে কম থাকে এই মরুভূমির গড় তাপমাত্রা প্রায় ৬৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট(১৮ডিগ্রি সেলসিয়াস)।বছরের পর বছর বৃষ্টি না হওয়ার কারণে এখানকার পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা। মাইলের পর মাইল হেঁটে গেলেও দেখা যাবে না কোনো উদ্ভিদ বা প্রাণীর। তবে এই মরুভুমির যে সব স্থানে বৃস্টি হয় সেখানে ঘটে অদ্ভুত ঘটনা, মরুভুমির বালির নীচে সুপ্ত অবস্থায় থাকে লক্ষ লক্ষ ফুলের বীজ,বৃস্টির পানি বালির নীচে প্রবেশ করে এই সব ফুলের বীজগুলোতে প্রাণের সঞ্চার করে।ধীরে ধীরে গাছ গুলো বেড়ে উঠে এবং বিভিন্ন রঙের ফুল ফুটতে থাকে,একে সুপার ব্লুম বলা হয়।
মে মাসের দিকে বৃষ্টি হয় আর সেপ্টেম্বর নভেম্বরের দিকে মরুভূমির মাঝে ফুলের দেখা মিলে। এই ফুলের গাছ ছাড়া আতাকামা মরুভূমিতে আর কোনো প্রকার বৃক্ষের খোঁজ পাওয়া যায় না। এই মরুভূমির অধিকাংশ জায়গাই পাথুরে ভূমি,ধুসর বালি,লবণ হ্রদ এবং ফেলসিক লাভা দিয়ে ঢাকা।এর নিচে রয়েছে খনিজ সম্পদের এক বিশাল ভাণ্ডার। আটাকামা মরুভূমির বেশিরভাগ অংশ প্লেস নামক ঘন লবণ সঞ্চিত হয়ে আছে যা কয়েক মাইলের মধ্যে প্রায় অর্ধ মিটার পুরু (১.৬ ফুট) হয়। আটাকামা মরুভুমির ফাকা অংশে ৪৩৫ মাইল লম্বা (৭০০ কিমি) এবং ১২ মাইল (২০ কিমি) প্রশস্ত একটি স্তর আছে যা নাইট্র্রেট বেল্ট নামে পরিচিত। রাসায়নিক সার এবং বিস্ফোরক তৈরীতে এর ব্যবহার করা হয়।
আতাকামা মরুভূমিটি পুরো গাছপালাবর্জিত। ১৮ থেকে ১৯ শতকে রুপালি এবং সল্টপিটার খনির সঙ্গে যুক্ত জ্বালানি কাঠের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বন উজাড় হয়ে যায়। পৃথিবীর প্রাচীনতম মরুভূমি, কমপক্ষে তিন মিলিয়ন বছর ধরে হাইপারডিটির ফলে এটি শুষ্ক এবং সবচেয়ে পুরোনো অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। আতাকামা মরুভূমির কিছু অংশে শুষ্ক অবস্থা প্রায় ২০০ মিলিয়ন বছর ধরে অব্যাহত রয়েছে। আতাকামা এতটাই শুষ্ক যে, ৬০০০ মিটার উঁচু অংশটাও হিমবাহ থেকে মুক্ত। শুধু সর্বোচ্চ চূড়া ওজোস দেল সালাডো, মন্টে পিসিস এবং লুল্লাইলাকোতে কিছু স্থায়ী তুষার রয়েছে। ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে বের করেছেন কিছু নদীর তল ১২০ হাজার বছর ধরে শুকিয়ে রয়েছে। পাশাপাশি এটি একমাত্র প্রকৃত মরুভূমি যেখানে মেরু মরুভূমির চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হয়। মঙ্গল অভিযানের সিমুলেশনের জন্য পৃথিবীতে পরীক্ষামূলক সাইট হিসেবে ব্যবহৃত হয় আতাকামা মরুভূমি
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত চিলি এই মরুভুমি থেকে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করতো এবং চিলির সম্পদের এক বিরাট অংশের যোগান দেয় এই মরুভূমি।একসময় বিশ্বের নাইট্রেট ব্যবসায় চিলির ছিল একক আধিপত্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর কৃত্রিম নাইট্রেটের উদ্ভাবন আতাকামা থেকে নাইট্রেট নিষ্কাশনে ভাটার সৃষ্টি করে এবং চিলি নাইট্রেটের একটি আঞ্চলিক বাজারে পরিণত হয়। ফলে চিলি সরকার তামার খনিশিল্পে মনোযোগ দেন। বর্তমানে এই তামার খনিগুলিই অঞ্চলটির মূল আয়ের উৎস।এছাড়াও আছে লিথিয়াম,তামা এবং আয়ওডিন। আটাকাম মরুভুমি পৃথিবীতে কয়েকটি স্থানের মধ্যে একটি, যেখানে বছরের অধিকাংশ দিনই মেঘমুক্ত পরিস্কার আকাশ দেখতে পাওয়া যায়। আটাকামা মরুভূমি স্টারগেজিং জন্য বিখ্যাত,মহাকাশ বিষয়ক গবেষনার জন্য বিশ্বের সেরা স্থান।
এখানে আছে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা,পূর্ব এশিয়া এবং চিলি প্রজাতন্ত্রের আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় পরিচালিত বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ৬৬ টি বেতার দূরবীনের শক্তিশালী একটি নেটওয়ার্ক যা আটাকামা লার্জ মিলিমিটার/সাব মিলিমিটার অ্যারে বা (ALMA).এই দুরবীন ব্যবহার করে মহাকাশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষনা করা হয়। এখানে আছে ইউরোপীয়ান স্পেস মানমন্দিরের ভেরী লার্জ টেলিস্কোপ। এই দূরবীন পৃথিবী থেকে ৪০ আলোকবর্ষের মধ্যে অবস্থিত পৃথিবীর মতো গ্রহগুলি (ট্র্যাপিস্ট-১ সিস্টেমটিকে) শনাক্ত করতে সাহায্য করেছে, এবং দূরবর্তী এক্সোপ্ল্যানেটের বায়ুমণ্ডলের তথ্য সংগ্রহ করেছে। এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং আবহাওয়া,যা কিনা মঙ্গল গ্রহের পরিবেশের সাথে অনেকটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর ফলে নাসা মঙ্গল গ্রহে কোনো মিশনের আগে সেখানে ব্যবহারের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি এখানে পরীক্ষামূলক ব্যবহার করে।
এই মরুভুমিতে ভ্যালি অফ ডেথ নামক একটি স্থান আছে সেখানে ৪০০ ফুট উচু বালিয়াড়ি আছে,যা স্যান্ডবোর্ডিংয়ের জন্য উপযুক্ত। আছে ভ্যালী ডি লা লুনা বা চাঁদের উপত্যকা এর চারিদিকে তাকালে মনে হবে আপনি চন্দ্রপৃষ্ঠে আছেন। এই মরুভূমির আরেক অনন্য নিদর্শন হলো হ্যান্ড অফ ডেজার্ট চিলির প্রখ্যাত ভাস্করশিল্পী মারিও ইররাজাবালার তৈরি এই ভাস্কর্য দেখতে অনেক দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকেরা ছুটে আসেন।