এখনও ঘুমাতে পারেনা পুলিশের নির্যাতনের শিকার রাজিব

নিজস্ব প্রতিবেদক

আইন-আদালত

ভয়ঙ্কর পুলিশি নির্যাতনের শিকার নিরপরাধ রাজিবের রাত কাটে এখনো নির্ঘুম। ঘুমালেই হঠাৎ চিৎকার করে ওঠেন। স্বপ্নে দেখে পুশিল

2022-03-05T19:15:04+00:00
2022-03-05T19:29:03+00:00
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬ ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬
   
তিন বছর পরে ঘটনা তদন্তে পিবিআইকে নির্দেশ আদালতের
এখনও ঘুমাতে পারেনা পুলিশের নির্যাতনের শিকার রাজিব
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শনিবার, ৫ মার্চ, ২০২২, ৭:১৫ পিএম  আপডেট: ০৫.০৩.২০২২ ৭:২৯ পিএম  (ভিজিট : ৩৮২)
X


ভয়ঙ্কর পুলিশি নির্যাতনের শিকার নিরপরাধ রাজিবের রাত কাটে এখনো নির্ঘুম। ঘুমালেই হঠাৎ চিৎকার করে ওঠেন। স্বপ্নে দেখে পুশিল তাকে নির্মম নির্যাতন করছে, মেরে ফেলতে তেড়ে আসছে। তিন বছর আগে ঢাকার কোতয়ালি থানায় ভয়ঙ্কর পুলিশি নির্যাতনের শিকার স্বর্ণ ব্যাবসায়ি রাজিব কর রাজু  এভাবেই নিজের বর্তমান অবস্থার কথা জানান। তিনি জানান, নির্যাতনে তিনি কেবল কর্মক্ষমতাই হারাননি, হয়েছেন সর্বশান্তও। 

পুলিশের নির্যাতনের ঘটনার পর দীর্ঘ তিন বছর তিনি পুলিশ সদরদপ্তর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মানবাধিকার কমিশন ও আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন বিচারের জন্য। কিন্তু এতোটা বছর বিচারের বাণি কেঁদেছে নিভৃতেই। অবশেষে তার আইনজীবী ইসরাত হাসানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩ মার্চ ঢাকা মহানগর দায়রা জজ ইমরুল কায়েস রাজিবের সঙ্গে ঘটা সেই ঘটনার তদন্ত করতে নির্দেশ দিয়েছে পিবিআইকে। একইসঙ্গে গঠন করতে বলেছেন মেডিকেল বোর্ড। আগামী ১৮ এপ্রিল তদন্ত প্রতিবেদন ও মেডিকেল বোর্ডের রিপোর্ট আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে।   

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইসরাত হাসান জানান, ঘটনাটি ঘটেছে ২০১৯ সালের ১০ ফেব্রæয়ারি ঢাকার কোতোয়ালি থানাধীন পুলিশের তৎকালীন এসআই মিজান, এ এস আই ফরিদ মিয়া ও এসআই জলিলের নেতৃত্বে। এই ঘটনাটি তখন ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে আসে এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি গোচর হয়। তখন থানার ওই কর্মকর্তাদের কোতোয়ালি থানা থেকে বদলি করা হয়।
ভুক্তভোগী রাজীব কর জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় বিচারের জন্য গিয়েছেন। সবশেষে অভিযুক্তরা ৪ লাখ টাকা ফেরত দিবে বলে তারা স্বীকার করেছে কিন্তু সেই টাকাও এখন পর্যন্ত ভুক্তভোগী পরিবারটি পায়নি। 

কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার টনকী ইউনিয়নের চৈনপুর গ্রামের রাজীব কর রাজু সময়ের আলোকে জানান, বর্তমানে একমাত্র দুধের বাচ্চার দুধ কিনে আনবার সার্মথ্য তার নেই সর্বস্ব হারিয়ে জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ঘটনার বিবরণ দিয়ে তিনি সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমি এক জন ফেরিওলার মত মানুষ, ঢাকা থেকে কিছু বানানো গহনা কিনে মফসলে বিক্রি করে বাবা-মা, স্ত্রী, নিয়ে জীবনযাপন করছিলাম। ২০১৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ২টা ৩০ মিনিটে ঢাকার কোতোয়ালি থানার ৩ পুলিশ কর্মকর্তা এ এস আই মিজান, এ এস আই ফরিদ ভূইয়া ও এস আই জলিল আমার বাসার কাঠের সিলিং ভেঙে ঢুকে পড়ে। এরপর বিনা ওয়ারেন্ট বা বিনা অভিযোগে আমায় হাত কড়া পরিয়ে আমার বাসা হতে ২৬ ভরি সাড়ে ১১ আনা স্বর্ণের গয়না, আমার মায়ের চোখ অপারেশনের জন্য রাখা ৪১,৩০০ টাকা সহ আমায় থানায় নিয়ে গিয়ে চোখ বেঁধে নির্মম নির্যাতন চালায়, আমাকে কোর্টে চালান করতে বলায় আরো বেপরোয়া নির্মম নির্যাতন শুরু করে, এমন কি আমার হাতের নখ তুলে ফেলে। ওইসময় আমি বার বার জ্ঞান হারিয়ে ফেললে, ভোর ৫ টার দিকে আমায় মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ২টা ইনজেকশন করে আবার থানায় আনা হয়। এরপর সকাল ৯ টার দিকে থানার দ্বিতীয় তলায় নিয়ে গিয়ে আবার বার বেদম নির্যাতন চালায়। আমাকে বলা হয় যদি তুই মুক্তি চাস তবে তোর বাড়ি থেকে আরো ৫ লাখ টাকা নিয়ে আসতে বল, না হয় তোকে কোন পেনডিং মামলা বা মাদকের মামলা দেখিয়ে গুলি করে মেরে ফেলবো। আর ছাড়া পেলে কোন দিন মুখ খুলতে পারবি না। আর ঢাকায়ও আসতে পারবি না। আমি উত্তরে বলি যে আমার যা যা ছিলো সবইতো আপনারা নিয়ে গেছেন আমি আর টাকা পাবো কোথায়? উত্তরে ওই নির্যাতনকারীরা বলে- কোথায় পাবি জানি না, তবে দিলে প্রাণে বাঁচবি। পরে এস আই মিজান তার থানার ড্রয়ার খুলে কিছু জিনিস দেখিয়ে বলেন, যে দেখ এগুলা চিনিস কি না, আমি বলি কি করে চিনবো। উত্তরে সে বলে, যদি আজ রাত ৮ টার মধ্যে টাকা না পাই তা হলে তোকে গুলি করে মেরে ফেলব। বলব যে তুই মাদক ব্যবসায়ী , তোর কাছে এগুলা ছিলো। ভয় পেয়ে আমি আমার দেশের বাড়িতে যোগাযোগ করলে আমার পরিবার কান্নায় ভেঙে পড়ে। আমার পরিবার অতি কষ্টে ২ লাখ টাকা জোগাড় করলে আমি এস আই মিজান ও এস আই জলিলকে বলি। ওরা বলেন হবে না আমি তাদের পায়ে ধরে মিনতি করলে তারা আমার বুকে লাথি মারতে থাকে আর বলে, যদি তোকে জীবিত নিতে চায় তা হলে সন্ধ্যা ৭ টার মধ্যে টাকা নিয়ে থানায় আসতে বলবি, আমার বড় ভাই ও আমার বড় ভাইয়ের শ্যালক টাকা নিয়ে আসলে আমাকে মুক্তি দেয়। মুক্তি দেওয়ার সময় আমাকে সাদা কাগজে নাম ঠিকানা মোবাইল নাম্বার লিখে রাখে, আরো বলে দেন যে তোরে আরো ৩ দিন ঢাকায় থাকতে হবে, আর মনে রাখিস যে তুই যদি কোন দিন মুখ খুলিস তবে সেই দিনই হবে তোর শেষ দিন। তার পর থেকে আমি বিচারের জন্য বিভিন্ন মানুষের কাছে সহযোগিতা চাই, এমন কি আমি হোম মিনিস্টারের সরকারি বাস ভবনে গিয়ে বিবরণী দিয়ে একটা চিঠি দিয়ে আসি ও নির্যাতনের কিছু ছবি দেই। ২০১৯ সালের ৩০ মে কোতয়ালি থানায় কয়েকজন সাংবাদিককে নিয়ে গেছে ওসি আমার সঙ্গে হওয়া ঘটনা শোনেন ও দুঃখ প্রকাশ করেন। তখন ওসি তদন্ত বলেন যে ২/৩ দিনের মধ্যে আমরা বিচার করে তোমার ক্ষতি পুরন আদায় করে দিব। কিন্তু এই তিন বছরেও আমি আমার সঠিক বিচার থেকে বঞ্চিত এবং আমি মুখ খোলাতে আমার বাসার আশেপাশে গিয়ে ওই নির্যাতনকারিরা আমার ছবি বা আমায় মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে আসছেন।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘মিডিয়ার মাধ্যমে আমি ডি এম পি হেডকোয়ার্টারে একটা লিখিত অভিযোগ দেই ও ডিসি লালবাগে অভিযোগ দেই। কিন্তু আজও কোন বিচার পাইনি, এখন আমি আতংকে আছি। কখন জানি আমাকে মেরে ফেলা হয়।’ 
 
এ ব্যাপারে আইনজীবী ইসরাত হাসান বলেন, ‘রাজিবের ঘটনাটি খুবই নির্মম। ঢাকার কোতয়ালী থানার তৎকালিন এসআই মিজানুর রহমান (৪০), এএসআই ফরিদ ভ‚ঁইয়া (৩৫) ও এসআই জলিল (৩৫) রাজিবকে টাকার জন্য অমানুষিক নির্যাতন করেন। নির্যাতনের এক পর্যায়ে তাকে উলঙ্গ করে পুরুষাঙ্গে বৈদ্যুতিক শক দেয়। এরপর দুই লক্ষ টাকা ও মুচলেখা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেয়। প্রায় এক বছর চিকিৎসা নিতে হয় তাকে। এই ঘটনার বিচারের জন্য সে পুলিশ সদরদপ্তর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মানবাধিকার কমিশন ও আদালতের ঘুরেছে তিন বছর ধরে। কিন্তু বিচার পাননি। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সব দেখে তাদের ক্ষমতা থাকা স্বত্ত্বে ও রাজিবকে কোনো সাহায্য না করে বলেন মামলা করতে।’ এরপর মামলা করতেও অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়েছে উল্লেখ করে আইনজীবী ইশরাত বলেন, ‘সব শেষে গত ৩ মার্চ ঢাকা মহানগর দায়রা জজ ইমরুল কায়েস হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু আইনে করা মামলাটি আমলে নিয়ে ওই ঘটনার তদন্ত করতে নির্দেশ দিয়েছে পিবিআইকে। একইসঙ্গে গঠন করতে বলেছেন মেডিকেল বোর্ড। আগামী ১৮ এপ্রিল তদন্ত প্রতিবেদন ও মেডিকেল বোর্ডের রিপোর্ট আদালতে দাখিল করতে বলেন আদালত। এবার আশা করছি রাজিব দেরিতে হলেও ন্যায় বিচার পাবে।’ 

এ ব্যপারে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে এএসআই জলিল বলেন, ‘আমি কিছু বলবো না। বলা কিছু নাই।’ অন্যদিকে, এসআই মিজান ও ফরিদের মোবাইল ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে। 






Loading...
Loading...


আইন-আদালত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : bulletinadbd@gmail.com
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy