
X
আইসল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলীয় একটি প্রত্যন্ত এলাকা ব্রিয়াফজোরার। পোলার ডাক নামে এখানকার এক ধরনের বিরল প্রজাতির হাঁসের পালক কুড়িয়ে হাজার হাজার ইউরো আয় করছে স্থানীয় কৃষক সম্প্রদায়। এ কারণে আইসল্যান্ডকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে দামি পালকের দেশ। উপকূলীয় এলাকার কৃষিজীবীদের এ সংস্কৃতি হাজার বছরের পুরোনো। ওদের কুড়িয়ে আনা ওই পালক দিয়ে তৈরি হচ্ছে মূল্যবান সব লেপ-তোশক-কম্বল ও বিছানার চাদরসহ নানাবিধ শীতের কাপড়।
কয়েক শতাব্দী ধরেই বিশ্বব্যাপী অভিজাত মহলে আইডারডাউনের কদর আকাশছোঁয়া। অবশ্য স্ক্যান্ডিনেভিয়ান সামুদ্রিক যোদ্ধাদের সদস্য ভাইকিংরাও আইডারডাউন দিয়ে তাদের নরম বিছানা সাজাতো। এটি এতই মূল্যবান যে মধ্যযুগীয় কর সংগ্রহকারীরা মুদ্রার বিকল্প হিসেবে এটির ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল। আর আজকাল এই পালকের প্রধান ক্রেতা অতিধনীরা। আইডারডাউনের বৈশিষ্ট্য ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এককথায় এটি এক ধরনের হাঁসের ফিনফিনে পালক। এই পালক এতটাই হালকা ও নরম যে একটি ফুটবলের আকারের আইডারডাউন এক হাতের মুঠোয় এঁটে যায়।
আইডারডাউনের বৈশিষ্ট্য হলো এটি অত্যন্ত হালকা। যদিও যেই পাখি থেকে এটি সংগ্রহ করা হয় সেটি কিন্তু বিপরীত বৈশিষ্ট্যের। আইডার একটি চর্বিযুক্ত সামুদ্রিক পাখি। এটির চেহারা হাঁসের চেয়ে বরং পেঙ্গুইনের কাছাকাছি। তাদের বেশিরভাগ জীবন কাটে আর্কটিক সার্কেলে। প্রতি জুনে প্রায় ৫০০ হাঁস (আইডার) সমুদ্র থেকে এসে তার খামারে আশ্রয় নেয়। প্রাকৃতিকভাবে বড় উন্মুক্ত অঞ্চলে তারা বাসা বাঁধে না। আশ্রয় ও সুরক্ষা পেতে আইডার হাঁসগুলো মানববসতির কাছাকাছি জড়ো হয়। হাঁসগুলো একটা নিরাপদ নিরুপদ্রব জায়গা দেখে বাসা বাঁধে; টায়ার, দরজা এমনকি ঘরের মধ্যেও তারা বাসা বাঁধতে পারে।
সাধারণত গ্রীষ্মের শুরুতে পোলার হাঁসেরা ডিম পাড়ার উদ্দেশ্যে খুঁজতে থাকে কম জনবহুল এলাকা। সে কারণে তারা বেছে নেয় আইসল্যান্ডের উপকূলীয় এই অঞ্চলটি। এখানে অস্থায়ীভাবে বসত গড়ে তোলে তারা। কমন আইডার নামে সমধিক পরিচিত এস মলিসিমা প্রজাতির এই হাঁসগুলো সাধারণত ২০ থেকে ২৮ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়। এ প্রজাতির নারী হাঁসগুলোর পালকে বাদামির সঙ্গে কালো কিংবা নীলচে রং মেশানো থাকে। আইডার থেকে আসা পালকগুলোকে বলা হয় আইডারডাউন। বিশ্বব্যাপী বছরে পাওয়া ৪ টনেরও বেশি আইডারডাউনের তিন চতুর্থাংশই আসে আইসল্যান্ড থেকে। এক্ষেত্রে বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদক কানাডা এবং আর্কটিক সীমান্তবর্তী দেশগুলোর চেয়েও এগিয়ে তারা।
ডিম পাড়ার জন্য আইডাররা নিজেদের পালক ঝরিয়ে সেগুলো দিয়ে বাসা তৈরি করে। আর এ রকম ৬০টি বাসা থেকে ১ কেজি পালক সংগ্রহ করা যায়। অত্যন্ত নরম এ পালক থেকে পাওয়া তন্তুর তৈরি পোশাকও ভীষণ আরামদায়ক। আর এ কারণেই আইসল্যান্ডের ব্রিয়াফজোরার অঞ্চলের এই কৃষকদের ভাগ্য খুলে গেছে। আইডারদের পালক কুড়ানোর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন আইসল্যান্ডের এই উপকূলের প্রায় ৪০০ কৃষক। এরপর সেগুলো প্রক্রিয়া করা হয়। বছরে প্রায় ৩ হাজার কেজি আইডারডাউন বিক্রি করেন তারা। আইডারডাউন সংগ্রহের প্রাচীন ঐতিহ্যই কিন্তু পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এবং আইডার হাঁসের বেঁচে থাকতে ভূমিকা রাখছে। আর বিশ্বজুড়ে হাতেগোনা কিছু অতিধনী ক্রেতা তাদের এই বিলাসপণ্যটি এখনো পাচ্ছেন।
মৌসুম এলেই তারা বিদেশি ব্যবসায়ীদের কাছে তা রপ্তানি করে আয় করেন হাজার হাজার ইউরো। ৮০০ গ্রাম পালক দিয়ে তৈরি একটি সাধারণ কম্বলের মূল্য আইসল্যান্ডের মুদ্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার ক্রোনু (৪ হাজার ৩৫০ ইউরো)। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা। আর একটি চাদর বানাতে প্রয়োজন হয় ৬০০ থেকে ১৬০০ গ্রাম পালকের। স্থানীয় আইডার ফার্মিং অ্যাসোসিয়েশনের মতে, ১৫টি আইসল্যান্ডীয় কোম্পানি আইডারডাউন রপ্তানি করছে। আর এ থেকে আসে আইসল্যান্ডের বৈদেশিক মুদ্রার বড় একটি অংশ। প্রাথমিকভাবে কুড়িয়ে আনা পালকগুলোকে ১২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় জীবাণুমুক্ত করে পরিষ্কার করা হয়। এক কেজি পালক পরিষ্কার করে শুকাতে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা সময় লাগে তাদের। আইসল্যান্ডীয় আইন অনুসারে, সাফাই, গন্ধ, রং এবং ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে বিক্রি করার আগে আইডারডাউনের অবশ্যই কঠোর মানের নিয়ন্ত্রণ পাশ করাতে হয়।
পেলিকান হাঁসরা নিজের পেট ছিদ্র করে বাচ্চাদের রক্ত খাওয়ানোর কথা ভাবতো। পৌরাণিক গল্পটি নৃশংস মনে হলেও এটি কিন্তু অনেক বড় আত্মত্যাগের পরিচয়ও। আইডার হাঁসরাও বাচ্চাদের জন্য নিজেদের শরীর স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। অবশ্য তারা রক্ত ঢেলে দেয় না, তারা দেয় নিজের বুকের পালক। বুকের বিশেষ ধরনের নরম পালক দিয়ে তারা বাসা বানায়। প্রায় ২৮ দিন ধরে সেই বাসায় ডিমে তা দেয়। এসময় তাদের শরীরের এক তৃতীয়াংশ ওজন কমে যায়। এমনকি কিছু আইডার অনাহারে মারা যায়। ইনকিউবেশন শেষে ডিম ফোটে এবং মায়েরা তার সন্তানদের নিয়ে সমুদ্রে ফিরে যায়। আইডারডাউন সংগ্রাহক সেই যাজক বলেন, এরপরই তিনি বাসাগুলো গ্রহন করেন।
আইডারডাউন সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের প্রক্রিয়াটি খুব শ্রমসাধ্য একটি কাজ। আর অপ্রতুলতা ও গুণাগুণ আইডারডাউনকে একটি বিরল বিলাসবহুল পণ্যে পরিণত করেছে। সংগ্রহ শেষে আইডারডাউন অবশ্যই শুকনো ও গুণমানে উন্নত হতে হয়। আর পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয় একেবারে হাতে। আইডারডাউনের গুচ্ছগুলোর মধ্যে হাঁসের পালক বা অন্য কোনো শক্ত উপাদান থাকে না। তাই এগুলো অত্যন্ত নরম হয়। শরীরে ছোঁয়ালে এক অনন্য অনুভূতি সৃষ্টি করে। সাধারণত আইডারডাউনে তৈরি পণ্য বা লেপগুলোর আয়ু হয় ৪০ বছর পর্যন্ত। তবে অত্যন্ত নরম এই আইডারডাউনের দীর্ঘায়ু পেতে সঠিক রক্ষাণাবেক্ষণের দরকার হয়।
আইডারডাউন এখন বিলাসপণ্য হলেও এর সংগ্রাহক ও প্রাথমিক বিপণনের সঙ্গে জড়িতরা কিন্তু বঞ্চিত হোন। আইডাইডাউন সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে যুক্ত এক লুথেরিয়ান যাজক আইডারডাউনকে কোকেনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কারণ সবচেয়ে উষ্ণ প্রাকৃতিক এই তন্তু বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত দামী হলেও সংগ্রহকারীরা সামান্য অর্থ পেয়ে থাকেন।