শ্রীপুরে তিন নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু, কর্ম পরিবেশ ও নিরাপত্তার বালাই ছিল না

আনিছুর রহমান শামীম, শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি

সারাবাংলা

গাজীপুরের শ্রীপুরে কারখানার নির্মানাধীন ভবনের কাজ করার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তিন নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ছাদে রড উঠাতে

2023-03-31T11:49:41+00:00
2023-03-31T11:49:41+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
শ্রীপুরে তিন নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু, কর্ম পরিবেশ ও নিরাপত্তার বালাই ছিল না
আনিছুর রহমান শামীম, শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩১ মার্চ, ২০২৩, ১১:৪৯ এএম   (ভিজিট : ১৫৭)
X


গাজীপুরের শ্রীপুরে কারখানার নির্মানাধীন ভবনের কাজ করার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তিন নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ছাদে রড উঠাতে গিয়ে কাত হয়ে বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে তাদের মৃত্যু হয়। কাজের স্থানে কোনোরকম নিরাপদ কর্ম পরিবেশ ও নিরাপত্তার বালাই ছিল না বলে জানিয়েছে স্থানীয় লোকজন।

বৃহস্পতিবার (৩০ মার্চ) সকাল ৮ টায় শ্রীপুর পৌরসভার কেওয়া পূর্ব খন্ড এলাকার আরমাদা স্পিনিং মিলস লিমিটেডে (ইউনিট-২) দুর্ঘটনাটি ঘটে। কারখানার মানব সম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের সহকারী মহা-ব্যবস্থাপক (এজিএম) আরিফুল ইসলাম বিষিয়টি নিশ্চিত করেছেন।

নিহতরা হলো নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চর কচ্ছপিয়া গ্রামের আমজাদ হোসেনের ছেলে পিয়াস (২০), একই গ্রামের বেলাল সওদাগরের ছেলে পাভেল (২৩) এবং জামালপুর জেলার বকশিগঞ্জ উপজেলার বগারচর গ্রামের মুকুল হোসেনের ছেলে মনোয়ার হোসেন (২৫)। তারা আলিফ এন্টারপ্রাইজের অধীনে দৈনিক মজুরী ভিত্তিতে ওই কারখানায় নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করছিলো। ঘটনার পর থেকে ওই এন্টারপ্রাইজের ঠিকাদার ইব্রাহিম খান পলাতক রয়েছে।

শ্রীপুরের মাওনা ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার ইফতেখার হোসেন রায়হান ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, আরমাদা স্পিনিং কারখানায় সকাল ৮টায় অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটলেও আমার সকাল ৯টা ১০ মিনিটে খবর পাই। খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে ৯টা ২৫ মিনিটে পৌঁছাতে সক্ষম হই। কারখানায় প্রবেশ করে দেখতে পাই ওই কারখানায় তিন তলা ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। দৈনিক হাজিরা ভিত্তিতে তিন নির্মাণ শ্রমিক কাজ করছিল। এসময় তারা ২৫ মিলি রড রশি দিয়ে উপরে উঠাচ্ছিল। আকষ্মিক রডগুলো পাশ দিয়ে (কারখানার বাহির দিয়ে) প্রবাহিত ১১ হাজার ভোল্টের বিদ্যুতের তারে পড়ে যায়। মুহূর্তেই বিদ্যুতায়িত হয়ে তিন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। তাদের শরীর ঝলসানো অবস্থায় পাওয়া গেছে। তবে কি কারণে লাশ বালি দিয়ে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল তা কারখানায় কর্মরত ব্যাক্তিরা বলতে পারবে।

স্টেশন অফিসার আরও জানান, আমরা নিহতদের মরদেহ বালির নিচে চাপা দেওয়া অবস্থায় দেখতে পাই এবং উদ্ধার করি। তাদের শরীর ঝলসানো অবস্থায় পাওয়া গেছে। তবে কি কারণে লাশ বালি দিয়ে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল তা বলতে পারছি না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিহতদের কয়েক সহকর্মী জানায়, ভবন নির্মাণে নিরাপত্তাজনিত কোনো ধরণের ব্যবস্থা ছিল না। হাতে গ্লাভস, পায়ে প্লাস্টিকের জুতা, মাথায় প্লাস্টিকের টুপি বা অন্য কোনো ধরণের ন্যুনতম নিরাপত্তার ব্যবস্থাও ছিল না। ভবনটি শুরু থেকে তিন তলা পর্যন্ত নির্মাণে নিরাপদ এবং নিরাপত্তার কোনো বালাই ছিলনা। পুড়ে যাওয়া মরদেহের দুর্গন্ধে সেগুলো বালির নিচে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল।  

প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় সাংবাদিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোফাজ্জল হোসেন, রফিকুল ইসলাম, নয়ন জানান, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আগুনে পোড়ার গন্ধ পাওয়া যায়। পরে সকাল পৌণে ৯ টার দিকে কারখানার গেইটে উৎসুক জনতা ভীড় করতে থাকে। সাংবাদিকেরা প্রবেশ করতে চাইলে তাদেরও বাধা দেওয়া হয়। কিছু সাংবাদিক ও স্থানীয় কয়েকজন ব্যাক্তি ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের সাথে কারখানায় প্রবেশ করে। এসময় ছবি তুলতে চাইলে কর্মরত শ্রমিকেরা সেখানেও সাংবাদিকদের বাধা দেয়। শ্রমিকদের মধ্যে থেকে একজন শ্রমিক কৌশেলে আঙ্গুল উঁচিয়ে ভবনের পাশে বালির নিচে লাশ থাকার কথা জানায় সাংবাদিকেদর। ওই স্থানে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের যেতে দিলেও সেখানে সংবাদকর্মীদর যেতে বাধা দেওয়া হয়। লাশ পুড়ার গন্ধে ভিতরে দাঁড়িয়ে থাকা কষ্ট হচ্ছিল। নিহতের খবর ছড়িয়ে পড়লে কারখানার প্রধান ফটকে উৎসুক জনতা লাঠিসোঠা ও লোহার রড দিয়ে আঘাত করার পর গেইট খুলে দেওয়া হয়।

সরেজমিন দেখা যায় নির্মাণাধীন ওই ভবনের সামনে দুটি বালুর ঢিবি রয়েছে। নিহত তিন জনের লাশ একটি ঢিবিতে মধ্যে বালুচাপা দেওয়া অবস্থায় ছিল। কারখানার এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার পর তিন শ্রমিকের শরীরে আগুন ধরে গিয়েছিল। আগুন নেভানোর জন্যই তাঁদের বালুর ঢিবিতে ফেলা হয়েছিল।

ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ (মাওনা জোনাল) অফিসের উপ-মহা ব্যবস্থাপক (ডিজিএম) আহমদ শাহ আল জাবের জানান, সকাল ৯ টার দিকে হঠাৎ আমাদের দক্ষিন পাশের লাইন বন্ধ হয়ে যায়। পরে খবর নিয়ে জানতে পারি কেওয়া পূর্ব খন্ড এলাকার আরমাদা স্পিনিং মিলস লিমিটেড-২ এ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তিন নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আমাদের বিদ্যুৎ কর্মীরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।

শ্রীপুর পৌরসভার প্রকৌশলী হারুনুর রশীদ ও সার্ভেয়ার মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল জানান, স্কাইনীট পাওয়ার কোম্পানী লিমিটেডের কাছ থেকে আরমাদা স্পিনিং লিমিটেড কারখানাটি কিনে নেয়। তাদের মধ্যে লেনদেন হলেও কাগজপত্র সম্পাদন এখনও বাকী রয়েছে বলে জানা গেছে। আলীফ এন্টারপ্রাইজ কারখানা ভবন নির্মাণের অনুমোদন নিয়েছে। আলীফ এন্টারপ্রাইজের কাছ থেকে ঠিকাদার ইব্রাহীম কাজের অনুমোদন নিয়ে ভবন নির্মাণের কাজ করছে। ঠিকাদার ইব্রাহীমকে শ্রমিক সরবরাহ করেছে গোলাম রব্বানী।

ওই কারখানার শ্রমিকদের ঠিকাদার মোহাম্মদ রব্বানী জানান, পিয়াস, পাভেল ও মনোয়ার সকাল সাতটার দিকে কাজে আসে। তারা কারখানার পশ্চিম পাশের ভবনের ওপর রড তোলার কাজ করছিলেন। সকাল ৮ টার দিকে ২৫ মিলি (প্রায় ২০ ফুট লম্বা) রড খাড়া করার সময় রডটি (ওজন বেশি হওয়ায়) কাত হয়ে যায় এবং পাশের একটি বৈদ্যুতিক উচ্চ ভোল্টের (১১ হাজার ভোল্ট) তারের সঙ্গে রডের সংস্পর্শ হলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলে তিন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। তারা গত এক বছর যাবত আলিফ এন্টারপ্রাইজের অধীনে এ কারখানায় নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করছে।

নিহত তিন শ্রমিকদের কোনো ধরনের সেইফটি ইকুইপমেন্ট দেওয়া হয়েছেলি কিনা এ বিষয়ে জানতে চাইলে কারখানার সহকারী মহা-ব্যবস্থাপক (রক্ষণাবেক্ষন) নজরুল ইসলাম বলেন আমি ঘটনার সময় কারখানায় উপস্থিত ছিলাম না।

তিনি আরো বলেন, মরদেহ বালিচাপা থাকার বিষয়টি আমার জানা নেই। কর্তৃপক্ষ বা অন্যান্য কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগের পরার্মশ দিয়ে তিনি মুঠোফোন কেটে দেন। এসময় কারখানার অন্য কোনো কর্মকর্তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। বিষয়টি জেনে আপনাকে (সাংবাদিককে) জানাতে পারব এবং আধা ঘন্টা পর আবার যোগযোগ করতে বলেন বিষয়টি জানার জন্য। আধা ঘন্টা পর ফোন দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি এবং পরবর্তীতে ওই কর্মকর্তার মবোইল ফোন বন্ধ পওয়া যায়।

স্থানীয়রা জানান, কারখানার যেসব কর্মকর্তা ছিলেন তারা তিন শ্রমিক নিহতের পর পালিয়ে গেছেন।

শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল ফজল মো: নাসিম জানান, পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজ উদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে। বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত এ ঘটনায় কেউ অভিযোগ করতে আসেনি। তবে পুলিশ আইনী প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যাবে।

-বাবু/এ.এস





  বিষয়:   কর্ম পরিবেশ  নিরাপত্তা 



Loading...
Loading...


সারাবাংলা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy