ঈদের আগে ফের স্বপ্নভঙ্গ ব্যবসায়ীদের

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানী

রাজধানীতে একের পর এক অগ্নিকাণ্ড, মাত্র দশ দিনের ব্যবধান। এরমধ্যেই আগুনে পুড়ল রাজধানীর কাপড়ের অন্যতম প্রধান দুই মার্কেট।

2023-04-15T21:18:37+00:00
2023-04-15T21:29:46+00:00
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬ ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬
   
নিউ মার্কেট
ঈদের আগে ফের স্বপ্নভঙ্গ ব্যবসায়ীদের
রাজধানীতে একের পর এক অগ্নিকাণ্ড নিয়ে জনমনে নানান প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শনিবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৩, ৯:১৮ পিএম  আপডেট: ১৫.০৪.২০২৩ ৯:২৯ পিএম  (ভিজিট : ১৯৬)
X

রাজধানীতে একের পর এক অগ্নিকাণ্ড, মাত্র দশ দিনের ব্যবধান। এরমধ্যেই আগুনে পুড়ল রাজধানীর কাপড়ের অন্যতম প্রধান দুই মার্কেট। দুই মার্কেটেই আগুন লাগার সময় মোটামুটি একই। বঙ্গবাজারে আগুন লেগেছিল ভোর ৬টা ১০ মিনিটে, আর আজ নিউ সুপার মার্কেটে আগুন লাগে ভোর ৫টা ৪০ মিনিটে। দুই মার্কেটেই ক্ষতির চিত্রেও মিল রয়েছে। ঈদের আগে বেচাকেনার জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুতি নেওয়া ছিল ব্যবসায়ীদের। আগুন কেড়ে নিয়েছে সব। 

মোটামুটি ঘণ্টা চারেকের আগুনে পুড়েছে নিউ সুপার মার্কেট। তাতেই সর্বনাশ যা হওয়ার হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর ব্যবসায়ীরা মার্কেটের ভেতরে ঢুকে দেখেন সব শেষ। যে কাপড়গুলো পোড়েনি সেগুলোও নষ্ট হয়েছে পানিতে ভিজে। দুপুরেও এই মার্কেট থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। ব্যবসায়ীরা নিজ নিজ দোকানে ঢুকে কাগজপত্র, টাকাপয়সা যা পাচ্ছেন বস্তায় ভরে বের করছেন। 

বিভিন্ন মার্কেটে আগুনের ঘটনা ষড়যন্ত্র বা নাশকতা কী না তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শনিবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার ও জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের সভায় বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি এ নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, দেশব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ মার্কেটগুলোতে নজরদারি বাড়াতে হবে। অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের অগ্নি-সন্ত্রাসের বিষয়টি জড়িত আছে কী না তাও তদন্ত করে দেখতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, তারা অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটিয়ে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করছে কী না তা খতিয়ে দেখতে হবে। সবাইকে আরো বেশি সচেতন থাকতে হবে। নিজস্ব উদ্যোগে পাহারার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে সকল প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফায়ার সার্ভিসের আগুন নেভানোর সময় অযথা ভিড় করা যাবে না। কোনো প্রকার বাধা দেওয়া হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের রমনা জোনের ডিসি মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের সাথে সমন্বয় করে কাজ করছে। আমরা খেয়াল রাখছি যেন কোনো দুষ্কৃতকারী এই জায়গায় কোনো ধরনের ঝামেলা তৈরি করতে না পারে। এদিকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মার্কেট খোলা হবে না বলে জানিয়েছেন নিউমার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ডা. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন। তিনি বলেন,  নিউমার্কেটের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা প্রাধান্য দিচ্ছি। সব দোকান মালিকদের সঙ্গে নিয়ে আমরা এখানে অবস্থান করছি। যতক্ষণ পর্যন্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না হবে অর্থ্যাৎ সম্পূর্ণভাবে আগুন না নিভবে ততক্ষণ পর্যন্ত মার্কেট খোলা হবে না। সবার সাথে বসে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

চলতি মাসেই রাজধানীর বড় দুটি মার্কেটে আগুনে নিজের সব পুঁজি হারিয়েছেন বহু ব্যবসায়ী। আজ ঢাকা নিউ সুপার মার্কেটের অনেক ব্যবসায়ীর ভাগ্যেও একই নিয়তি লেখা হয়ে গেছে। নিউ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় সুলতান ফ্যাশন নামের একটি দোকান ছিল আলেয়া নামে এক নারীর। 

নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ী আলেয়া জানান, ঈদের জন্য প্রায় ১১ লাখ টাকা ঋণ করে কয়েক হাজার প্যান্ট কিনেছিলেন। সব মিলিয়ে ৫০ লাখ টাকার বেশি প্যান্ট ছিল দোকানটিতে। কিন্তু এক আগুনে সব পুড়ে গেল। আলেয়া বলেন, এমনিতেই তো সব শেষ। এখন এত টাকা ঋণ কীভাবে দেব, পরিবার নিয়ে ঢাকায় কীভাবে থাকব, বাড়ি ভাড়া দেব কীভাবে? গতকালও এই ফুটওভার ব্রিজের সিঁড়ি ভালো দেখে গেছি। সন্ধ্যার পর সিঁড়ি ভেঙে ফেলেছে। কেন এমন করল? কার কাছে এই কথা বলতে যাব। কে আগুন লাগিয়েছে?

আরেক ব্যবসায়ী মো. সজিব বলেন, সারা বছর ব্রিজ ভাঙার খবর নেই। এই ঈদের আগে চোরের মতো রাতের আঁধারে কেন ব্রিজ ভাঙতে হবে? পরশুদিন আর গতকাল রাতে ব্রিজ ভেঙে দিয়েছে যাতে মানুষ মার্কেটে উঠতে না পারে। আর আজ লাগল আগুন। এ কেমন রহস্য!

রফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ী জানান, আমাদের যা ক্ষতি হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। এখন ঘুরে দেখছি কোনো কূলকিনারা পাওয়া যায় কী না। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে আমার পাইকারি দোকানে বিশ লাখেরও বেশি টাকার কাপড় ওঠানো ছিল। আজ হোলসেল ডেলিভারি দেওয়ার জন্য অনেকগুলো প্যাকেট কমপ্লিট করে রাতে বাসায় গিয়েছিলাম। সকালে এসে দেখলাম সব শেষ। এখন কীভাবে ঘুরে দাঁড়াব সেটি বুঝতে পারছি না।

আয়েশা ফ্যাশনের কর্মী মোহাম্মদ সুমন বলেন, গতকাল থেকে মার্কেটে অনেক মানুষ হওয়া শুরু করেছে। আমি গতকাল রাত ১টা পর্যন্ত ডিউটি করেছি। আর আজ ভোরে আগুন লাগল। ওয়ান পিস আইটেমের দোকান ছিল। ঈদ উপলক্ষে অনেক টাকার মাল উঠিয়েছিল মহাজন। সব শেষ হয়ে গেল। আগুনে কী পরিমাণ দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সে তথ্য এসব দোকান মালিক-কর্মচারী বলতে পারেননি। তবে আগুন লাগার চেয়ে ‘লাগানো হয়েছে’ বলেই তাদের বিশ্বাস।

এদিকে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন জানিয়েছেন, নিউ সুপার মার্কেটে লাগা আগুনে ২৫০ দোকান পুড়েছে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ শত কোটি টাকা। তিনি আরও বলেন, আগুন লাগা নিউ সুপার মার্কেটের তিন তলা ভবনে ১২শটির মতো দোকান রয়েছে। আমরা এখন পর্যন্ত ধারণ করছি- প্রায় ২৫০টির মতো দোকান পুড়ে গেছে। কারণ এক পাশ আগুনে একেবারে পুড়ে গেছে। এছাড়া অনেকগুলো দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

নিউ সুপার মার্কেট মূলত কাপড়ের মার্কেট। এখানে শাড়ি, লেহেঙ্গা, থ্রি-পিস, শার্ট-প্যান্ট এবং পাঞ্জাবিসহ নানা ধরনের কাপড় ছিল। এছাড়া খেলনা ও আসবাবপত্রসহ নানা ধরনের পণ্য ছিল। এই মার্কেটের তৃতীয় তলার ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম বলেন, গতকাল রাত ২টা পর্যন্ত দোকানে ছিলাম। ভোরে খবর শুনি, আগুন লেগেছে। এসে দেখি মার্কেটের তৃতীয় তলায় আগুন জ্বলছে। কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তিনি আরও বলেন, আগুনে আমার দোকানের সবকিছু পুড়ে গেছে। আমার স্বপ্ন শেষ ভাই। আমি এখন কী করব? ঈদ উপক্ষ্যে ঋণ করে ১০ লাখ টাকার মাল এনেছি, সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

কিছুদিন আগে এমন অবস্থা হয়েছে বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ীদের। আয়ের উৎস দোকানের সব মালামাল পুড়ে যাওয়ার পর সেখানকার ব্যবসায়ীরাও নিঃস্ব হয়েছেন। এদিকে নিউ সুপার মার্কেটের এই আগুনের জন্য  সিটি করপোরেশনকে দায়ী করছেন মার্কেটের মালিক সমিতির সভাপতি। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের লোক রাত ৩টার দিকে ব্রিজ ভাঙার কাজ করছিল। ব্রিজের ওখানে আমাদের কারেন্টের লাইন আছে সেটা তারা খেয়াল করেনি। ওই লাইনের ওপর বুলডোজার চালানোর সময়ই আগুনের সূত্রপাত হয়। তারা কোনো পরিকল্পনা না করে এই ব্রিজ ভাঙার কারণেই আজ এই দশা হয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক বলেছেন, আপনারা জানেন আমাদের মার্কেটগুলো যেভাবে তৈরি করা, যার বেশিরভাগই ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে ফায়ার সার্ভিস অনেকগুলো মার্কেট ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে। আমাদের পুলিশের পক্ষ থেকে আমরা সবগুলো বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত করব। এগুলো নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনও কারণ আছে তা খতিয়ে দেখা হবে। শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত নিউ মার্কেট এলাকায় পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন বলেছেন, ঈদের আগে কেন মার্কেটে মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যেন বিষয়টি খতিয়ে দেখে। আজ সকাল সোয়া ১০টার দিকে ফায়ার সার্ভিস মহাপরিচালক নিউ মার্কেটের ৪ নম্বর গেটের সামনে এক ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন।

ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন রাখেন, ঈদের ঠিক আগে একের পর এক মার্কেটে আগুন লাগার ঘটনা ঘটছে। অধিকাংশ আগুন ভোরে ঘটছে। ব্যবসায়ীরা অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এই আগুনের ঘটনাগুলো একই সূত্রে গাঁথা কী না? নাশকতা কী না? জবাবে ফায়ার সার্ভিস মহাপরিচালক বলেন, আমি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে অনুরোধ করব এ বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য। কেন একের পর এক মার্কেটগুলোতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে।

সম্প্রতি দেশে ঘটে যাওয়া কয়েকটি বড় অগ্নি দুর্ঘটনা নাশকতা হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। আইজিপি বলেন, আমরা ইদানীং লক্ষ্য করছি রাজধানীর কয়েকটি মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। অগ্নিকাণ্ডের প্রতিটি ঘটনা বাংলাদেশ পুলিশ খতিয়ে দেখছে। এখানে যদি কোন নাশকতা থাকে তাহলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অপরদিকে রাজধানীর নিউ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় আগুন লাগার সঙ্গে পদচারী সেতুর (ফুটওভার ব্রিজ) সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণে করপোরেশন থেকে নেওয়া উদ্যোগকে সম্পর্কিত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে মনে করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী সালেহ আহম্মেদ বলেন, পুরাতন ফুটওভার ব্রিজ ভেঙে নতুন ফুটওভার ব্রিজ বানানোর দাবি ছিল জনগণের। যেহেতু ব্রিজটি ঝুঁকিপূর্ণ, তাই ঈদে ওভারলোডের কারণে যেন কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে, সেজন্য বন্ধের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঈদে কোনো একটা দুর্ঘটনা ঘটলে এর দায়িত্ব কে নেবে?

বাবু/জেএম




  বিষয়:   সপ্নভঙ্গ  ব্যবসায়ী 



Loading...
Loading...


রাজধানী এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy