
X
শনিবার ভোরে রাজধানীর ঢাকা নিউ সুপার মার্কেটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ব্যবসায়ীদের মালামাল উদ্ধারে অন্যতম ভূমিকা রাখা পুলিশ কনস্টোবল উজ্জ্বল কুমার রায়ের বাড়ি লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের দলগ্রাম, দক্ষিণ শ্রীখাতা গ্রামে। তার পরিবারে বাবা-মা,বোন ও তার স্ত্রী। বোন তুষভান্ডার মহিলা কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। মা তাপসী রানী । বাবা রবীন্দ্রনাথ রবি একজন সাইকেল মেকানিক। নিজের কোন জায়গা জমি নেই অন্যের জমিতে জুপড়ি ঘরে বসবাস তাদের।
সোমবার ১৭ এপ্রিল পুলিশ কনস্টোবল উজ্জ্বলের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তার বাবা রবীন্দ্র নাথ রবির সাথে কথা হলে তিনি বলেন, সাইকেল মেকানিকের কাজ করে উজ্জ্বলকে মানুষ করেছি, কখনো ভাবেনি পুলিশের চাকরি করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারবে। ছোট থেকেই সে অনেক সহজ সরল ছিল, নিজে গরিব হলেও আমাদের টাকার প্রতি লোভ নেই। ভাঙা বাড়িতে থাকি তো কী হয়েছে? মানুষতো আমাদের ঘুষ খোর বলতে পারবে না।
উজ্জ্বলের মা তাপসী রানী বলেন, আমি সব সময় চেয়েছি, সে বড় হয়ে মানুষের জন্য কাজ করবে। কিন্তু আমরা জানতাম না সে পুলিশের চাকরি পাবে। যখন পুলিশের চাকরি পায় তখন বুক ভরে গিয়েছিল। আজ ছেলে সৎ পথে থেকে মানুষের জন্য কাজ করছে। যতই কষ্ট হোক তাকে সৎ পথে থেকে মানুষের সেবা করতে হবে।
তার স্ত্রী নিরুপমা রানী বলেন, আমি সব সময় চেয়েছিলাম যে একটা সৎ মানুষ আমার জীবনে স্বামী হিসেবে আসুক। সৃষ্টিকর্তা সেই আশা পূরণ করেছেন। তার সঙ্গে প্রায় ৩ বছরের সংসারে কখনো কোনো ধরনের কটু কথা হয়নি। নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ীদের কথা ভেবে তাদের মালামাল উদ্ধারে আমার স্বামী যে ভূমিকা রেখেছেন, এতে আমরা গর্ববোধ করছি।
পুলিশ কনস্টেবল উজ্জ্বল রায় বলেন, ‘ছবি ভাইরাল হবে সেই চিন্তায় আমরা কাজ করিনি। ব্যবসায়ীদের কান্না আর আহাজারি দেখে আমাদের নিজের মনুষ্যত্ব নাড়া দিয়েছিল। ঊর্ধ্বতন স্যারদের নির্দেশে ঢাকা নিউ সুপার মার্কেটের মালামাল সরানোর চেষ্টা করি। যেটি আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। দেশের মানুষকে নিরাপদে রাখতে সরকার আমাদের চাকরি দিয়েছেন। এখন দেশের মানুষের জন্য যদি কাজ করতে না পারি তাহলে পুলিশের চাকরি কেন নিয়েছি।
পারিবারিক অবস্থা নিয়ে জানতে চাইলে উজ্জ্বল বলেন, আমার পরিবার অনেক কষ্ট করে আমাকে মানুষ করেছেন। তাদের এই বিশ্বাস যে আমার দ্বারা দেশের মানুষের ক্ষতি হবে না। সেই চেষ্টা করে যাচ্ছি। সৎ পথে আছি, অবশ্যই একদিন সৃষ্টিকর্তা ভালো কিছু দেবেন সেই বিশ্বাস আছে এবং থাকবে।
এলাকাবাসী জানান, উজ্জ্বলের পরিবারের একটি জরাজীর্ণ ঘর রয়েছে। সেই ঘরেই থাকে তার বাবা-মা ও স্ত্রীসহ একমাত্র বোন। সেই ঘরটিও অন্যের জমিতে। বাবা সাইকেল মেকানিক। সন্তানদের লেখাপড়া করাতে তার আয়ের একমাত্র উৎস সাইকেল মেকানিক। তার মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসারের অর্থ যোগান দেন। বাবা-মায়ের কষ্ট কখনো সন্তানদের বুঝতে দেননি। তারা চেয়েছেন তাদের সন্তান দেশের মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনুক। উজ্জ্বল রায় ছোট থেকে অনেক সহজ সরল মনের মানুষ ছিলেন। প্রায় ৫ বছর আগে ঘুষ ছাড়াই পুলিশে চাকরি পেয়ে যোগ দেন। শনিবার উজ্বল ঢাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়ানো দেখে আমরা গর্বিত। কিন্তু পাঁচ বছরেও তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ছেলে চাকরি পেলেও তাদের থাকতে হচ্ছে অন্যের জমিতে। তাই তাদের জন্য সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছেন স্থানীয়রা।
কালীগঞ্জ কে ইউ পি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খুরশিদুজ্জামান আহমেদ বলেন, ২০১৫ এসএসসি ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিল উজ্জ্বল রায়। শিক্ষার্থী হিসাবে আচার-আচরণ চালচলন কথাবার্তা পোশাকে সে আদর্শ শিক্ষার্থীর পরিচয়। আর সম্প্রতি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সবার কাছে অনুকরণীয়। তবে এখনো তার বাবা-মা জরাজীর্ণ বাড়িতে থাকছেন। আশা করছি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যারা আছেন তারা এই বিষয়ে দৃষ্টি দেবেন।
বাবু/জেএম