মাদকের ডেরা জেনেভা ক্যাম্প

ইমরান আলী

রাজধানী

# পঁচিশ নিহতের পর ইয়াবার ডন ‘পাকিস্তানি রাজু’# পাঁচশ’র বেশি স্পটে প্রকাশ্যে বিক্রি হয় ইয়াবা, গাঁজা ও ফেন্সিডিলরাজধানীর

2023-05-06T12:28:11+00:00
2023-05-06T12:28:11+00:00
শুক্রবার ৭ আগস্ট ২০২৬ ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার ৭ আগস্ট ২০২৬
   
মাদকের ডেরা জেনেভা ক্যাম্প
ইমরান আলী
প্রকাশ: শনিবার, ৬ মে, ২০২৩, ১২:২৮ পিএম   (ভিজিট : ৪৯৩)
X


# পঁচিশ নিহতের পর ইয়াবার ডন ‘পাকিস্তানি রাজু’
# পাঁচশ’র বেশি স্পটে প্রকাশ্যে বিক্রি হয় ইয়াবা, গাঁজা ও ফেন্সিডিল 

রাজধানীর মোহাম্মদপুরস্থ জেনেভা ক্যাম্পে প্রায় লাখ খানেক আটকেপড়া পাকিস্তানির বসবাস। ক্যাম্পের ঘিঞ্জি পরিবেশে গড়ে উঠেছে বিশাল মাদকের বাজার। পুরো রাজধানীর মাদকের ডেরা বললেও ভুল হবে না। এখানে পাঁচশ’রও বেশি মাদকের স্পট। ক্যাম্পের বা মোহাম্মদপুর এলাকার ইয়াবা ডন হিসেবে পরিচিত পঁচিশের মৃত্যুর পর পাকিস্তনি রাজু এখন নতুন ডন।

ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার এইচ এম আজিমুল হক বলেন, ক্যাম্পগুলোকে ঘিরে আমরা শতাধিক মামলা দিয়েছি। এর পিছনে তাদের বিরাট সিন্ডিকেট কাজ করে। জটিলতা হচ্ছে, আমাদেরকে একজন মাদক ব্যবসায়ীকে ধরে আদালতে সোপর্দ করতে হয়। তারা যেকোনোভাবে একটা সময় পরে জামিনে বের হয়ে আসে। কিছু দিন গা ঢাকা দিয়ে থাকার পর আবার তারা একই কাজ করে।

সূত্রমতে, মাদকের আখড়া হিসেবে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের কুখ্যাতি রয়েছে। দেশব্যাপী জোরদার মাদকবিরোধী অভিযানের সময় এই ক্যাম্পেও কয়েক দফায় বড় অভিযান চালানো হয়। তার পরও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি মাদক ব্যবসা।

সরেজমিন দেখা যায়, জেনেভা ক্যাম্প বা বিহারি ক্যাম্পের চারপাশেই নানারকম দোকানপাট। ঘনবসতিপূর্ণ এই ক্যাম্পের ভেতরে প্রচুর অলিগলি। সেগুলোতেও অনেক দোকান। মনে হতে পারে, পুরো ক্যাম্পই যেন একটি মার্কেট! সেখানে প্রচুর লোকজনের আনাগোনা। এমন ভিড়ের মধ্যেই কিছু স্থানে চলছে ইয়াবা, গাঁজা ও হেরোইন বেচাকেনা। ক্যাম্পের বাইরে হুমায়ুন রোড-সংলগ্ন আলফালাহ মেডিকেল এলাকার ডাস্টবিন মোড় তেমনই একটি স্পট। স্থানীয় এক যুবককে সঙ্গে নিয়ে ওই এলাকায় গিয়ে আলো-আঁধারির মধ্যে কয়েকজনকে মাদক বিকিকিনি করতে দেখা যায়। এ স্পটটি বেজি নাদিম ও তার লোকজন চালায় বলেও জানা গেল। বিক্রেতার মধ্যে রয়েছে মটকি সীমা, পাগলা মনু ওরফে লম্বু মনু। পারভেজ ও কলিম এখানকার দুই শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী। এভাবে একে একে বেশ কয়েকটি স্পট খুঁজে পাওয়া যায়। ফকিরার ইমামবাড়ার পাশে দেখা গেল আরেকটি জটলা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখান থেকে বিভিন্ন ক্রেতার কাছে মাদক সরবরাহ করা হচ্ছে। পরিচিত ক্রেতারা ফোনে অর্ডার দিয়েছে, সেই অনুযায়ী তাদের দেওয়া ঠিকানায় মাদক পৌঁছে দিয়ে আসবে বিক্রেতারা। এর জন্য টাকা কিছুটা বেশি নেওয়া হয়। এবি ব্লকের পাকিস্তানি পান দোকান এলাকার স্পটটি চালায় ল্যাংড়া সুমন নামে একজন। তার ইয়াবা ব্যবসায় সহায়তা করে রাজা ও শাহাজাদা নামে দুই ভাই। শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ইশতিয়াকের বড় ভাই রাজু, দুই ভাই মামুন ও মাহমুদ এবং আবীর ফাট্টা এই স্পটের অন্যতম ব্যবসায়ী।

এদিকে জয়নাল হোটেলের মোড়ের (তিন রাস্তার মোড়) মাদক স্পট নিয়ন্ত্রণ করে ইমতিয়াজ। তার অধীনে কাজ করে কোপ মনু, চার ভাই হাসিব, মনির, হীরা ও সনু এবং মুতনা আরজু। গওহরের দোকান স্পটে মাদক বিক্রি করে চোর জানু ও টুনটুন। গোবরপট্টি রোডের শহীদ হোটেল এলাকায় মাদকের ডিলার চুহা সেলিমের শ্যালক রানার সঙ্গে আছে চোর নূর, শাহনাজ, আরজু, রাজু ও ময়লা সেলিম। সৈনিক লীগ মোড়ের বিক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে গোলাম কসাই, মফিজ সুমন, চুসনি রাজু, কালু রহমান, ফর্মা মোস্তাকিম, পিচ্চি সাগর ও মোটকা রুবেল। মুরগিপট্টিতে আছে সৈয়দপুরী নওশাদ, মাউরা রাসেল, বাবু, রাজা, ভাতিজা রুবেল ও শমসদ। মাছপট্টিতে রয়েছে লম্বু আজিজ ওরফে হান্ড্রেড আজিজ, তার বড় ভাই পোলার, বুড্ডা রাজু ও জনি। সি-ব্লকের পাক্কি এলাকা রীতিমতো পারিবারিক স্পট। সেখানে জম্বু সেলিমের ভগ্নিপতি তবলচি আসলাম, ভাই তোতা, আরেক ভাই বালাম, বোন পুতুল ও ছেলে পিকু মাদক বিক্রি করে। একই ব্লকের হাওয়ামাঠ গাঁজা স্পট হিসেবে পরিচিত। সেখানে নাজায়েজ জয়নুলের নেতৃত্বে রয়েছে মোনা, সগীর ওরফে গোর্কা সগীর ও শাহাবুদ্দিন। ৯ নম্বরে (এনএলআরসি অফিসের সামনে) রয়েছে আরেকটি গাঁজা স্পট। সেখানে রানী, তার মেয়ে শারমিন, আরেক মেয়ে তাজু, ছোট ভাই মনসুর, তার স্ত্রী জয়া গাঁজা বিক্রি করে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জেনেভা ক্যাম্পের ইয়াবা গডফাদার হিসেবে পরিচিত ছিল পঁচিশ। র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে গেল বছর মারা যায় পঁচিশ। তার মৃত্যুর পর জেনেভা ক্যাম্পের আরেক ইয়াবা কারবারি ইশতিয়াক চলে যায় আত্মগোপনে। রাজুর ছোট ভাইয়ের শ্বশুর ‘মেন্টাল আসলাম’ ইশতিয়াকের বোন জামাই। এ ছাড়া ধরা পরে বেশ কয়েকজন চিহ্নিত মাদক কারবারি। সেসময় ক্যাম্প ছেড়ে যায় রাজু ও তার পরিবার।

জানা যায়, রাজু বিভিন্ন সময় রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বসবাস করছে এবং নিয়মিত ঠিকানা পাল্টাচ্ছে। ক্যাম্প ছাড়ার পর পুরান ঢাকার নবাবপুরে তার আনাগোনা বেশি ছিল। এরপর ঘন ঘন জায়গা পরিবর্তন করে কখনো পুরান ঢাকায়, কখনো আদাবর, কখনো হাজারীবাগে রাজু বাস করে। সম্প্রতি মোহম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান মোড় এলাকায় ¯’ানীয় এক নেতাদের সঙ্গে রাজুর আনাগোনা দেখা গেছে।

যেসব এলাকায় রাজুর ইয়াবার কারবার: মোহাম্মদপুর ও আশপাশের এলাকার প্রায় তিন শতাধিক ইয়াবা কারকারি রাজুর নিয়ন্ত্রণাধীন। তার দেয়া ইয়াবা বিক্রি করেন এসব ডিলার। তাদের মধ্যে অন্যতম আন্ডে, জাম্বু ওরফে কসাই জাম্বু, শাকিল ওরফে বাবা শাকিল, মাউরা রাসেল ও তার স্ত্রী, ওয়াসিম ওরফে ফরমা ওয়াসিম। এদের প্রত্যেকেই আটকে পড়া পাকিস্তানি আর জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা। তাদের ইয়াবা নেটওয়ার্ক রয়েছে জেনেভা ক্যাম্প, টোল ক্যাম্প, টাউনহল ক্যাম্প, জান্নাতবাগ ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায়। কৃষি মার্কেট সংলগ্ন ক্যাম্পে ইয়াবা ব্যবসা পরিচালনা করছেন তুষার, সরফু, মজো বিকি, কালা চান, জাবেদ গাঞ্জা জাবেন, পাইজামা ওয়ালির ছেলে আরমান, নিহত ইয়াবা কারবারি পঁচিশের ভাই আরমান। ক্যাম্পের হুসেন পান দোকানের সামনে আর তাজমহল রোড ও ক্যাম্পের পেছনে কমিউনিটি সেন্টারের সামনে তারা ক্রেতাদের হাতে ইয়াবা তুলে দিচ্ছে।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে রাজুর উত্থান ও কর্মকান্ড সম্পর্কে জানিয়েছেন ক্যাম্পের অনেক বাসিন্দা। জেনেভা ক্যাম্পের এক যুবক বলেন, ‘রাজু পান দোকান করত। তারপর ইয়াবা ব্যবসা শুরু করল। হুট করে টাকার মালিক হয়ে গেল।’
অপর এক বাসিন্দা বলেন, ‘শুধু ক্যাম্প না। ক্যাম্পের আশপাশে যত ইয়াবা সিন্ডিকেট আছে, সব রাজুর লোকজন। ওদের অনেক ক্ষমতা, তাই কেউ মুখ খুলতে পারে না।’ পঁচিশের মতো চিহ্নিত ইয়াবা কারবারির শাস্তি হওয়ায় খুশি ক্যাম্পের অনেকেই। তবে রাজুসহ অন্যান্য ইয়াবা ব্যবসায়ীদেরও উৎখাত করার দাবি ক্যাম্পবাসীর।

ক্যাম্পের অপর এক বাসিন্দা বলেন, ‘ক্যাম্পের নামে নানা অভিযোগ। সবাই জানে আমরা ইয়াবা ব্যবসা করি। আসলে ক্যাম্পের লোকজন যারা ইয়াবা ব্যবসা করে, তাদের ইয়াবা বিক্রি ও খাওয়া শিখিয়েছে পাকিস্তানি রাজুরা। এদের নির্মূল করতে পারলে সব সমস্যার সমাধান হবে।’

জেনেভা ক্যাম্পের ইয়াবা কারকারিদের বেশিরভাগে এখন ক্যাম্পের বাইরে রয়েছে বলে তথ্য রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আছে। র‌্যাব-২ এর কোম্পানি কমান্ডার মহিউদ্দিন ফারুকী বলেন, ‘২০১৮ ও ২০১৯ সালে জেনেভা ক্যাম্পের মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়। সাঁড়াশি অভিযানের পর কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। জেনেভা ক্যাম্পকেন্দ্রিক যারা মাদক ব্যবসায়ী, যারা বিহারি এখন আস্তে আস্তে বাংলাদেশে স্থায়ী হয়েছে। তারা এখন আর ক্যাম্পে থাকে না। কারণ এরা অঢেল টাকাপয়সার মালিক হয়েছে আমাদের কাছে এমনও তথ্য আছে। পাশাপাশি তারা ক্যাম্পের আশপাশে, বিভিন্ন জায়গায় থাকে।’

-বাবু/এ.এস





  বিষয়:   জেনেভা ক্যাম্প  ডেরা 



Loading...
Loading...


রাজধানী এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : bulletinadbd@gmail.com
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy