
X
আগামী ২৫ মে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সর্বত্র চলছে জমজমাট প্রচার প্রচারণা। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আজমত উল্লাহ খানের পক্ষে প্রচারণা ছিল চোখে পড়ার মতো। গাজীপুরের আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ, মহিলা লীগ ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে একযোগে নগরীর ৫৭টি ওয়ার্ডে নৌকার পক্ষে ব্যাপক গণসংযোগ চালাচ্ছে। আজমত উল্লাহর পেছনে একট্টা হয়ে মাঠে নেমেছে তার দল ও সমর্থকরা।
মেয়র পদ ও দল থেকে বহিষ্কৃত জাহাঙ্গীর আলমের বিরোধিতা ও ষড়যন্ত্রের মুখে পাল্টে গেছে গাজীপুরের চিত্র। বরং এখন একা হয়ে পড়েছেন জাহাঙ্গীর। প্রথম দিকে দলের নেতা-কর্মীদের কেউ কেউ না বুঝে তার সাথে থাকলেও এখন আর কেউ নেই। তার আত্মঅহমিকা, দল সম্পর্কে উল্টাপাল্টা বক্তব্য এবং গাজীপুরে বিভিন্ন বিতর্কিত কাজে জড়িয়ে পড়ায় তাকে এখন মানুষ বর্জন করা শুরু করেছে।
এ অবস্থায় জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধাচারণ গাজীপুরে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আজমত উল্লার জন্য শাপে বর হয়েছে। জাহাঙ্গীর আলম বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন ফরম কিনেছেন এবং মনোনয়ন জমাও দিয়েছিলেন। কিন্তু তার মনোনয়ন বাতিল হয়ে গেছে। মনোনয়ন বাতিল হোক বা গৃহীত হোক সেটা বড় বিষয় নয়, তার স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত এবং তার কিছু বক্তব্য গাজীপুর আওয়ামী লীগের মধ্যে তীব্র বিতর্ক তৈরি করেছে। এমনকি যারা বিভিন্ন সময়ে জাহাঙ্গীরকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন, যারা আজমত উল্লার বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরকে পাদপ্রদীপে আনার জন্য চেষ্টা করেছিলেন তারা পর্যন্ত জাহাঙ্গীরের ওপর রুষ্ট এবং ক্ষুব্ধ হয়েছেন। আর এ কারণেই এখন জাহাঙ্গীর গাজীপুর আওয়ামী লীগে এক ঘরে হয়ে পড়েছেন। তার মুষ্টিমেয় কিছু সমর্থক, তল্পিবাহক গোষ্ঠী ছাড়া আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মী জাহাঙ্গীরের পক্ষে নেই।
ইতিমধ্যেই জাহাঙ্গীর আলমকে আওয়ামী লীগ আজীবনের জন্য বহিষ্কারও করেছেন। গত সপ্তাহে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন জাহাঙ্গীরকে বহিষ্কারের কঠোর বার্তাও দিয়েছিলেন। কিন্তু চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী। এটি বুঝতে পেরেই গাজীপুরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তার সঙ্গ ত্যাগ করেছে। তারা এখন জাহাঙ্গীরের সঙ্গে কথাবার্তা বলা থেকেও বিরত থাকছে। জাহাঙ্গীর দৃশ্যত গাজীপুরে একা হয়ে গেছে।
২০১৩ নির্বাচনে আজমত উল্লা বিএনপি প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। এই সময় জাহাঙ্গীরসহ আওয়ামী লীগের একটি অংশ আজমত উল্লার বিরুদ্ধে গোপনে কাজ করেছিল এবং আওয়ামী লীগের এই বিভক্তির কারণে শেষ পর্যন্ত আজমত উল্লা পরাজিত হয়েছিলেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
২০১৮ নির্বাচনে জাহাঙ্গীর আওয়ামী লীগের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার পৃষ্ঠপোষকতা পান এবং তার মনোনয়ন লাভ অনেকটা নিশ্চিত হয়ে যায়। এই মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ার পর আজমত উল্লা জাহাঙ্গীরের পক্ষে কাজ করেছেন। তিনি জাহাঙ্গীরের বিভিন্ন অপমান এবং লাঞ্ছনা সহ্য করেও দলের স্বার্থে গাজীপুর আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন। কিন্তু জাহাঙ্গীর মেয়র হওয়ার পর আওয়ামী লীগের ওপর বিরূপ আচরণ শুরু করেন। আওয়ামী লীগের যারা ত্যাগী পরীক্ষিত তাদেরকে বাদ দিয়ে একটি বিকল্প আওয়ামী লীগ গঠন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তার টাকার ঝন ঝনানীর কারণে নব্য আওয়ামী লীগারদের দাপট বেড়ে যায় গাজীপুরে। কিন্তু এই পরিস্থিতি বেশিদিন চলেনি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘিরে অসৌজন্যমূলক বক্তব্যের কারণে আওয়ামী লীগ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। পরবর্তীতে তিনি মেয়র পদ হারান। এরকম পরিস্থিতিতে এবারের নির্বাচনে জাহাঙ্গীর যে মনোনয়ন পাবেন না তা মোটামুটি নিশ্চিত ছিল। যদিও আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির এক সভায় যারা দলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকম কর্মকাণ্ডে জড়িত তাদেরকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা মানে এই নয় যে তিনি আবার নির্বাচনের মনোনয়ন পাবেন। বরং জাহাঙ্গীর যদি দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে আজমত উল্লার পক্ষে প্রকাশ্যে কাজ করতো বা নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েও থাকতো তাহলে তার এই পরিণত হতো না।
জাহাঙ্গীর আওয়ামী লীগের মনোনয়ন সিদ্ধান্ত হওয়ার পর একের পর এক বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন এবং তার কিছু বক্তব্য ধৃষ্টতাপূর্ণ, ঔদ্ধত্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এর প্রেক্ষাপটেই এখন জাহাঙ্গীর সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের। ফলে গাজীপুরে গত এক দশকের মধ্যে আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ অবস্থায় আছে এবং এই ঐক্যবদ্ধ অবস্থান শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারলে আজমত উল্লা গাজীপুরের নির্বাচনে সহজ জয় পাবেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
গত কয়েকদিন সরেজমিনে গাজীপুর সিটির বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিদিনই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের অংশগ্রহণে বিশাল বিশাল নৌকা নিয়ে নগরীর অলিগলি ও মহল্লায় আজমত উল্লাহর পক্ষে খণ্ড খণ্ড মিছিল করছে। তারা গানের তালে তালে মেয়র প্রার্থী আজমতের জন্য ভোট প্রার্থনা করছেন। রাত পর্যন্ত গণসংযোগ, স্লোগান আর মিছিলে মেতে থাকে পুরো নগরী।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আজমত উল্লাহ খান গত শুক্রবার ও শনিবার টঙ্গী বাজার বড় মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে মুসল্লিদের সঙ্গে কুশলবিনিময় করে ভোট ও দোয়া চান। পরে তিনি টঙ্গী বিসিক, পাগার, ফকির মার্কেট, মরকুন, টিঅ্যান্ডটি, গোপালপুর, রেলস্টেশন এলাকা, বনমালা রোড, হাজি মার্কেট, গাজীপুরাসহ বিভিন্ন স্থানে পথসভায় বক্তব্য দেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘১৮ বছর টঙ্গী পৌরসভার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে জনবান্ধব মেয়র হিসেবে কাজ করেছি। আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ কেউ করেনি। নির্বাচিত হলে গাজীপুরকে দুর্নীতিমুক্ত, জবাবদিহিমূলক আধুনিক সিটি হিসেবে গড়ে তুলব।’
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ওপর হামলা ও গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ কখনো সংঘাত বা হানাহানির রাজনীতি করে না। আমরা কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রচারে বাধা দেওয়াকে মোটেই সমর্থন করি না।