
X
চট্টগ্রাম নগরীতে ডেঙ্গু ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে৷ ডেঙ্গু রোগের বিস্তার ঘটানোর জন্য দায়ী এডিস মশা নিধনের দ্বায়িত্ব যে সংস্থার সেই চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের দ্বায়িত্বশীলরা জানেন না চট্টগ্রাম নগরীতে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সঠিক সংখ্যা৷ তবে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. ইলিয়াছ চৌধুরী জানিয়েছেন, চলতি বছর এখন পর্যন্ত (৫ জুলাই) চট্টগ্রাম নগরীতে ৯ জনসহ চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গুতে মারা গেছে ১২ জন।
সর্বশেষ গত ৪ জুলাই রাত ৯টায় নগরীর বেসরকারি ক্লিনিকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে নগরীর সেন্ট স্কলাস্টিকা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী শ্রাবণী সরকার। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে শ্রাবণীর মা বিটু সরকার ও বড় ভাই কমার্স কলেজের উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বর্ষের ছাত্র সৌভিক সরকার অন্য আরেকটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
নগরীর সদরঘাট পোস্ট অফিস গলিতে বসবাস করা বিশ্বজিৎ সরকারের পুরো পরিবারটি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। শ্রাবণীর পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, তিন দিন যাবত জ্বরে আক্রান্ত থাকার পর গত ৩ জুলাই চিকিৎসকের পরামর্শে শ্রাবণী ও তার ভাইয়ের রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। পরদিন নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদনে তাদের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তাদের নমুনা পরীক্ষার ফলাফল থেকে জানা যায়, শ্রাবণীর রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ ১ লাখ ১০ হাজার ও সৌভিকের ১ লাখ ৬০ হাজার। চিকিৎসকের পরামর্শে তাদের বাসায় রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। প্লাটিলেটের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে বিভিন্ন ফলের জুস খাওয়ানোর পাশাপাশি জ্বরের ওষুধ খাওয়ানো হয়। মঙ্গলবার (৪ জুলাই) সকালের দিকে শ্রাবণীর জ্বর খানিকটা কমে আসে। তবে বিকেলের দিকে শ্রাবণীর পেট ফুলে যেতে থাকে রাত ৮টার দিকে তার শরীরে প্রচণ্ড কাঁপুনি দেখা দেয়। এসময় দ্রুত তাকে নগরীর জিইসি এলাকার মেডিক্যাল সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দ্রুত এনআইসিইউতে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেও ততক্ষণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে শ্রাবণী সরকার৷
চসিক'র ১০ নং উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ডে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি৷ জুন মাসে এই ওয়ার্ডের দুই শিশু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়৷ ১৪ জুন নগরীর পার্কভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় ১৪ বছরের সাকিবুল হাসিব। সাকিবের বাবা সোহরাব চৌধুরী বাংলাদেশ বুলেটিনকে বলেন, "আমার ছেলে সহ বাড়ির দুইজনকে পার্কভিউ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়৷ আমার ছেলে আক্রান্ত হওয়া ডেঙ্গুর ভেরিয়েন্টটি ছিল বেশ মারাত্মক৷ যদিও আমাদের অপর রোগীর অবস্থা আমার ছেলের চেয়েও খারাপ ছিল কিন্তু আমার ছেলে মুখে কিছু খেতে পারছিলো না৷ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত দুইজনের মধ্যে একজনকে আমরা জীবিত ফেরাতে পেরেছি।"
২৩ জুন একই ওয়ার্ডের মুন্সিপাড়ার বাসিন্দা আলী নওশাদ চৌধুরী বাবলার একমাত্র মেয়ে রাজিয়া আলী নুজরাইন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। নুজরাইনের বাবা কান্না জড়িত কণ্ঠে বাংলাদেশ বুলেটিনকে বলেন, "ডেঙ্গুতে আক্রান্ত আমার ৫ বছর ৯ মাস বয়সের মেয়েকে ১৭ জুন নগরীর ইম্পেরিয়াল এপলো হসপিটালে ভর্তি করাই৷ সেখানে আইসিউতে আমার মেয়ে ৭টি দিন বাঁচার জন্য অনেক লড়াই করে অবশেষে মারা গেছে।" এসময় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "চট্টগ্রামের ইতিহাসে এমন অকার্যকর সিটি মেয়র ও আমার ওয়ার্ডের মতন কাউন্সিলর আর দেখিনি৷ কাউন্সিলর নিছার উদ্দিন আহমেদ মঞ্জু আমাকে বেশ ভালো করেই চেনেন৷ গত চসিক নির্বাচনে ভোটের আগের রাতেও তিনি আমাকে ফোন করে বলেছিল, বাবলা ভাই আমাকে দেখতে হবে৷ অথচ তিনি আমার একমাত্র মেয়ের মৃত্যুর খবরটি জেনেও এখন পর্যন্ত একটি বার ন্যূনতম সমবেদনা পর্যন্ত জানালেন না৷ এমন কাউন্সিলর যেন আর কখনো নির্বাচিত না হয়।" তিনি অভিযোগ করে বলেন, "গত দুই বছর যাবত আমাদের এলাকায় ডেঙ্গু মশা তো দূরের কথা সাধারণ মশক নিধনে তেমন কোন উদ্যোগ নিতে দেখিনি৷"
এই বিষয়ে কাউন্সিলর নিছার উদ্দিন আহমেদের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি৷ এই দুটি মৃত্যুর ঘটনায় উত্তর কাট্টলী এলাকার বাসিন্দাদের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে৷ বিপরীতে কাউন্সিলর নিছার উদ্দিন আহমেদ মঞ্জুর কোন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি৷ ড. নিছার উদ্দিন আহমেদ মঞ্জু নামে তার একটি ফেসবুক আইডিতে এই সংক্রান্ত কোন পোস্টও দেখা যায়নি৷ বরং ২৩ তারিখ শিশু নুজরাইন মারা যাওয়ার পর দিন ২৪ জুন দুপুর ২টা ১২ মিনিটে তার ফেসবুকে সস্ত্রীক সাগর তলের (স্কুবা ড্রাইভ) তোলা একাধিক ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে লিখা হয়- "সাগরের তলদেশে আমরা- সে এক দারুণ অভিজ্ঞতা। সেই ফেসবুক পোস্টটিতেই একাধিক জন কমেন্টস করে ক্ষোভ ঝেরেছেন৷

রাজন ধর নামের একজন কমেন্টস করেন, "এলাকায় মানুষ মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ। দয়া করে সাগরের তলায় থেকে উঠে উপরে আসেন এরপর উত্তর কাট্টলিতে মশার স্প্রে ব্যবস্থা করুন"। নিলয় দাশ নামের একজন কমেন্টসে লিখেছেন,"উত্তর কাট্টলীতে মশার যন্ত্রণায়, আমাদের ও ঐ ভাবে সাগরে ডুব দিতে মন চায়।" এ সকল কমেন্টসে কাউন্সিলরের সেই আইডি থেকে কোন জবাব না দিলেও কাউন্সিলরের পক্ষে একাধিক জন রিপ্লে দিয়েছেন৷
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রমটি পরিচালনা করছেন চসিক মেয়রের পিএস আবুল হাসেম। ৫ জুলাই বাংলাদেশ বুলেটিনের সাথে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে আলাপের এক পর্যায়ে তিনি কাট্টলীতে দুইজন নয় একজন মারা গেছে বলে দাবি করেন৷ তিনি বলেন, একজন তো ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন৷ বয়স্ক ব্যক্তিটি একেবারে লাস্ট স্টেইজে ছিল সেই মৃত্যুকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে হিসেব করলে হবে না৷" স্থানীয় কাউন্সিলর থেকে তিনি একজন মারা যাওয়ার তথ্য পেয়েছেন বলে জানান৷ ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশক নিধন কার্যক্রম আরো জোরদার করতে নানান পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন৷ লোকবল ও মশক নিধনে ব্যবহৃত ফগার মেশিন বাড়ানোর পাশাপাশি ড্রোন ব্যবহার করে এডিস মশার আস্তানা খোঁজা হবে বলে জানান আবুল হাসেম।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. ইলিয়াছ চৌধুরী এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় ১২ জনের মৃত্যুর বিষয়টি বাংলাদেশ বুলেটিনকে নিশ্চিত করেছেন৷ সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জুলাই মাসের প্রথম চার দিনেই ডেঙ্গুতে মারা গেছে শিশুসহ ৩ জন। জুন মাসে ৬ জন মারা গেছে। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ৬৬১ জন। এর মধ্যে নগরে ৪৬১ জন, বিভিন্ন উপজেলায় ২০০ জন। মোট মারা গেছে ১২ জন।