নীলফামারীর কারাগারে অর্থের জন্য বন্দীদের নির্যাতনের অভিযোগ

সুভাষ বিশ্বাস, নীলফামারী

সারাবাংলা

কারাগারের অভ্যন্তরে ৩টি ওয়ার্ড কয়েদীদের লিজ দিয়ে অর্থের জন্য বন্দীদের উপর চরছে শারিরীক ও মানুষিকনির্যাতন। নির্যাতনের স্বীকার হয়ে

2023-07-08T18:03:19+00:00
2023-07-08T18:03:19+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
নীলফামারীর কারাগারে অর্থের জন্য বন্দীদের নির্যাতনের অভিযোগ
সুভাষ বিশ্বাস, নীলফামারী
প্রকাশ: শনিবার, ৮ জুলাই, ২০২৩, ৬:০৩ পিএম   (ভিজিট : ৩৭২)
X

কারাগারের অভ্যন্তরে ৩টি ওয়ার্ড কয়েদীদের লিজ দিয়ে অর্থের জন্য বন্দীদের উপর চরছে শারিরীক ও মানুষিক নির্যাতন। নির্যাতনের স্বীকার হয়ে দুলাল হোসেন আত্মহত্যার জন্য ব্লেড দিয়ে নিজের গলায় বিভিন্ন জায়গায় জখম করে। সে এখন নীলফামারী সদর হাসপাতালে পুলিশ প্রহরায় ভর্তি রয়েছে। তার আত্মহত্যা চেষ্টার সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে জেল থেকে ছাড়া পাওয়া বিভিন্ন কয়েদী ও হাজতিরা কারাগারের অভ্যন্তরের বিভিন্ন তথ্য গণমাধ্যমকে জানায়। সম্প্রতি ৬ জুলাই বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টায় হাজতি দুলাল হোসেনের শরীরে তীব্র ব্যথা দেখা দেয়, কারাগার কর্তৃপক্ষ প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর সুস্থ না হলে তাকে নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন।

গত ৭ জুলাই শুক্রবার দুপুরে নীলফামারী হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মো. জুলফিকার আলী নবাব বলেন, তীব্র কোমরের ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন নীলফামারীর পঞ্চপুকুর ইউনিয়নের মিলের পাড় এলাকার মাছ ব্যবসায়ী এনামু হকের পুত্র সাজাপ্রাপ্ত আসামি দুলাল হোসেন (৩২)। প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পরও সুস্থ না হওয়ায়, আমরা রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করি এবং কারারক্ষীরা তাকে দ্রুত নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরেই রাত সাড়ে এগারোটায় রক্তাক্ত অবস্থায় আবার তাকে নিয়ে আসে হাসপাতালে।  

কারাগারের অভ্যন্তরে তিস্তা, ডালিয়া, নীলসাগর নামে ৩টি ওয়ার্ড রয়েছে এ ওয়ার্ড গুলো প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে মাসিক চুক্তিতে ইজারা নেয় কয়েদীরা। আদালতের সাজা প্রাপ্ত পুরাতন দাগী আসামীরা মেট ও রাইটারের দায়িত্ব পালন করেন। এই  ওয়ার্ড গুলো ইজারা নিয়ে তারাই নিয়ন্ত্রণ করেন, এর মধ্যে যে ওয়ার্ডটি আমদানী ওয়ার্ড থাকে সেটি থাকে ভিআইপিদের জন্য বরাদ্দ।  এখানে ১শ থেকে ১৫০ বন্দী থাকার কথা থাকলেও সেখানে রাখা হয় ২৫/৩০ জন বন্দী। মোটা অর্থের বিনিময়ে গদির বিছানা, চৌকায় (রান্নাঘর) টাকার বিনিময়ে স্পেসাল রান্না করা খাবার সরবরাহ, ওয়ার্ডের অভ্যন্তরে থাকা বাথরুম ব্যবহারসহ বিভিন্ন মাদক, জুয়াখেলা ও মোবাইলে আপনজনদের সাথে কথা বলার সুবিধা ভোগ করে হজতীরা। 

এ কারণে আমদানী ওয়ার্ডটির ইজারা মূল্য থাকে ৩/৪ লাখ টাকা। আর অন্য ওয়ার্ডে ১ থেকে ১.৫ লাখ টাকা দিয়ে জেল কর্তৃপক্ষের কাছে ইজারায় নিয়ে কয়েদীরা নির্দিষ্ট অর্থের টার্গেট পূরণের জন্য বন্দিদের উপর চালায় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। এ কথা গুলো বলছিলেন একাধিক বার হাজতে থাকা আসামি বাবুল মিয়া। তিনি আরও বলেন, কারাগারে দুটি প্রশাসন কাজ করে, বাইরে নিয়ন্ত্রণ করে জেলখানা কর্তৃপক্ষ। এবং ওয়ার্ডগুলো নিয়ন্ত্রণ করে মেট ও কয়েদীরা। তাদের সর্বাচ্চ সহযোগিতা করে কারারক্ষীরা। জেলের ভিতরে বন্দী থাকা অবস্থায় কারও পক্ষে ভিতরের তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়, এটা জানতে পারলে তারও শাস্তি-বালিশ থ্যারাপি, এই আতঙ্কে সবাই চুপ থাকে, লজ্জার কথা কাউরে বলে না।  

উজ্জল হোসেন নামে আর এক কয়েদী জানান, বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতারা একটু সুবিধা পেলেও অন্য বন্দিদের অবস্থা করুণ, বাড়ি ঘরের ঘটি-বাটি বিক্রি করে মেটদের টাকা দিতে হয়, কতদিন থাকবে তার উপরে নির্ভর করে টাকার পরিমাণ। সেটা যদি না পায় তাহলে লেট্রিনের পাশে হবে তার বিছানা, প্রস্রাব ও পায়খানার দুর্গন্ধে  অসুস্থ হয়ে পরে। বাধ্য হয়ে ভাল জায়গার জন্য বাড়ির ঘটিবাটি জমিজমা বিক্রি করে টাকা দেয়। যেসব বন্দী এইসব অবস্থা সহ্য করেও টাকা না দিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করে তাদের বিভিন্নভাবে কারারক্ষিদের সহযোগিতায় চোখে গামছা বেঁধে শরীরের নিম্ন অংশের (পাছায়) দুজন কারারক্ষি লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকে। যতক্ষণ জ্ঞান না হারায়  ততক্ষণ চলে এ নির্যাতন। এই বালিশ থেরাপি দেখে অন্য বন্দিরা ভয়ে শেষ সম্পত্তিটা বিক্রি করে আপনজনদের কাছ থেকে টাকা এনে এদের চাহিদা পূরণ করে।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে সৈয়দপুর উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদের এক চেয়ারম্যান জানান, মিথ্যা মামলায় আমি একবার ৪ দিন কারাবাস করেছি। আমাকে আমদানী রুমে আপ্যায়ন করে সেখানকার মেট প্রথমেই আমাকে বলেন আপনি এখানে থাকবেন নাকি ওয়ার্ডে থাকবেন। যদি এখানে থাকেন তাহলে ৪ দিনে ২৮শ টাকা দিতে হবে। আপনি সকল ধরনের সুবিধা পাবেন। আর যদি ওয়ার্ডে থাকেন তাহলে ৪শ টাকা লাগবে। খাওয়া দাওয়া আপনার নিজ খরচ। আমি ২৮শ টাকা দিয়ে ৪ দিন আমদানী ওয়ার্ডে ছিলাম।    

মো. আইজুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন সময় জমি-জমা সংক্রান্ত মামলায় দের মাসের বেশি সময় কারাগারে ছিলাম। সেখান থেকে এক বন্দীর কাছে জানতে পারি অন্য এক বন্দী ব্যক্তি বাসায় গিয়ে স্ত্রী-স্বজনের কাছে টাকা নিয়ে আসে। চুরি বা ছিনতাই মামলার আসামি বা দীর্ঘ বছর ধরে সাজাপ্রাপ্ত বন্দীদের পরিবার থেকে টাকা দিতে না পারায় বন্দীর স্ত্রীদের সাথে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তোলে কারারক্ষীরা।

এ বিষয়ে নীলফামারী জেলা কারাগারের জেলার আবুল নূর মোহাম্মদ রেজা বলেন, আত্মহত্যার চেষ্টা চালানো দুলাল কয়েকটি মামলার আসামি। তিনি একটি মাদকের মামলায় আটক রয়েছে। কোর্টে তার জামিন হলেও জজের সামনে অসৎ আচারণ করায় জামিন না মঞ্জুর করে আবার তাকে কারাগারে প্রেরণ করে। কারা অভন্তরে এসব কিছুই ঘটে না, এ অভিযোগগুলো ঠিক না। আমি ৬ মাস হল এই কারাগারের দায়িত্বে আছি। তেমন কিছুই আমার চোখে পড়েনি।

জেলা প্রশাসক পঙ্কজ ঘোষ বলেন, কারাগার সম্পর্কে অনেক কিছু শুনেছি এবং কারাগারে যা কিছু অনিয়ম হচ্ছে তার দেখার দায়িত্ব হলো কারা কর্তৃপক্ষের, তবে জেলায় কারাগারের যে কমিটি রয়েছে সেখানে বিষয়টি উপস্থাপন করবো।

বাবু/জেএম





Loading...
Loading...


সারাবাংলা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy