প্রকাশ: বুধবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৩, ৪:২৭ পিএম আপডেট: ২৩.০৮.২০২৩ ৬:১০ পিএম (ভিজিট : ২৪৯৫)

X
চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা উপজেলার বারশত ইউনিয়নের এক ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে আদালতের জারি করা ১৪৫ ধারা ভঙ্গ করে জোরপূর্বক দেয়াল নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত ইপি সদস্য জমির হোসেন এই প্রতিবেদকের কাছে দেয়াল নির্মাণের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। এই ঘটনায় আদালতে মামলা দায়েরের পাশাপাশি স্থানীয় জেলা প্রশাসনকে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার।
জানা গেছে ২০ আগস্ট ভোর রাতে স্থানীয় আনোয়ারা উপজেলার বারশত ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোঃ জমির হোসেনের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী স্থানীয় ৭০ ঊর্ধ্ব সৈয়দ নূরের সীমানা দেয়া জমিতে প্রবেশ করে দেয়াল নির্মাণ করে। ক্যান্সারে আক্রান্ত বয়োবৃদ্ধ সৈয়দ নুর প্রতিবেদককে বলেন, এই জমি নিয়ে আমার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী নিলুফার ইয়াসমিন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে মিছ মামলা দায়ের করেন (মামলা নং ৪৪১/২০২৩ (আনোয়ারা)। আদালত আমাদের উভয় পক্ষকে বিএস ১০৬৩/১০৬৪/১০৬৫ ও ১০৬৬ দায়ের জমিতে স্থিতাবস্থা ও শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সতর্কীকরণ নোটিশ প্রদান করেন। সেই থেকে জায়গাটিতে এখন পর্যন্ত ১৪৫ ধারা বলবৎ আছে। ২০ আগস্ট ভোর রাতে স্থানীয় জমির মেম্বার দলবল নিয়ে প্রথমে আমাদের ঘরের বাহিরের দরজায় তালা লাগিয়ে দেয়। এসময় ঘরে আমি ও আমার স্ত্রী ছাড়া আর কেউ ছিল না কারণ আমার ৫ ছেলেই প্রবাসী। সকাল পর্যন্ত বিপুল লোকজন নিয়ে আমাদের জমির মাঝে দেয়াল নির্মাণ করে। ঘরের বাহিরে তালা লাগিয়ে দেয়ায় আমি ও আমার স্ত্রী অসহায় অবস্থায় আতঙ্কে ঘরে আবদ্ধ হয়ে থাকি। এই বিষয়ে থানায় অভিযোগ জানাতে গেলে থানা অভিযোগ গ্রহণ না করে আমাদের বৈঠকে বসার জন্য বারবার চাপ দিতে থাকেন৷ এখন বাধ্য হয়ে আমি আদালতে দুটি মামলা দায়ের করেছি। একই সাথে একজন জনপ্রতিনিধি হয়ে মাননীয় আদালতের নির্দেশ অমান্য করায় ইউপি সদস্য জমিরকে বরখাস্তের জন্য চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসন ও আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে লিখিত ভাবে আবেদন করেছি।

এ সকল অভিযোগের বিষয়ে প্রতিবেদক ২২ আগস্ট ইউপি সদস্য জমির হোসেনকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি রাত তিনটায় নয়, সকাল ৬ টায় দেয়াল নির্মাণ করেছি। জায়গাটি আমি নুর ইসলামের কাছ থেকে ক্রয় করেছি।” জমির বিএস দাগ নাম্বার উল্লেখ করে উক্ত জমিতে ১৪৫ ধারা বলবৎ থাকা অবস্থায় কীভাবে একজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে দেয়াল নির্মাণ করেছেন প্রশ্ন করলে মোঃ জমির হোসেন বলেন, “আমি ঐ প্রতিটি দাগ থেকেই জমি ক্রয় করেছি কিন্তু আমি ১৪৫ ধারা বিষয়টি জানতামই না।” ইউপি সদস্য জানতেন না বললেও প্রতিবেদকের হাতে নথি বলছে তিনি সবই জানতেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৯/০৭/২০২৩ইং তারিখে বটতলী ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা লক্ষীন্দর দাশ স্বাক্ষরিত ১৪৫ ধারার প্রতিবেদনে (স্মারক নং ১২৪-২০২৩,বট) নিরপেক্ষ সাক্ষী হিসেবে মোঃ জমির (মেম্বার) এর নাম উল্লেখ আছে। অর্থাৎ জমির মেম্বার জেনে শুনেই আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে পেশি শক্তির জোরে রাতের অন্ধকারে দেয়াল নির্মাণ করেছেন৷ রাত ৩ টায় দেয়াল নির্মাণের বিষয়টি সেই রাতে নির্মাণ কাজে অংশ নেয়া জাফর স্বীকার করেছেন৷ তিনি জানান, আমার ভগ্নিপতি ইউনুস রাত ৮টায় আমাকে জানান স্থানীয় জমির মেম্বারের একটি কাজ আছে৷ রাত সাড়ে ৩টায় আমাকে আমার বাসা থেকে ডেকে নিয়ে আরো লোকজন সহ ঐ জায়গায় নিয়ে গিয়ে দেয়াল নির্মাণ করায়। এসময় জমির মেম্বার নিজে দাঁড়িয়ে থেকে আমাদের কাজ করায়।
এই বিষয়ে বারশত ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কায়উম শাহ বাংলাদেশ বুলেটিনকে বলেন, আমি বিষয়টি জেনেছি৷ আমার ইউনিয়নের জমির মেম্বার যে কাজটি করেছে সেটা কোন ভাবেই গ্রহণ যোগ্য নয়৷ একজন জনপ্রতিনিধি হয়ে সে যে কাজ করেছে এটা বড্ড বাড়াবাড়ি। এই বিষয়ে আনোয়ারা ওসি সোহেল আহমদ বাংলাদেশ বুলেটিনকে বলেন, "যেহেতু জায়গাটিতে ১৪৫ রয়েছে তাই আমি বিষয়টি আদালতে জানাতে বলেছি।" তবে প্রতিবেদকের হাতে আসা একাধিক কল রেকর্ড বলছে ওসি সোহেল থানার অফিসারের মাধ্যমে বয়োবৃদ্ধ সৈয়দ নুরকে বারবার থানায় বৈঠকে যাওয়ার জন্য চাপ দিয়েছেন৷ এই বিষয়ে চট্টগ্রামের জেলা পিপি ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী বাংলাদেশ বুলেটিনকে বলেন, আদালতের নির্দেশনা থাকা অবস্থায় এমন কাজ অপরাধ৷ তার ওপর যদি কাজটি একজন জনপ্রতিনিধি করে থাকে তাহলে সেটি আরো বড় অপরাধ৷ বিষয়টি আদালতকে জানানোর পাশাপাশি ইউএনও ও জেলা প্রশাসককে জানালে তারাও ইউপি সদস্যের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারেন বলে জানান বিজ্ঞ এই আইনজীবী।
সার্বিক বিষয়টি বুধবার আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসতিয়াক ইমনকে জানালে তিনি বলেন, যদি আদালত ১৪৫ জারি করে থাকে এবং এই অবস্থায় যদি কেউ সেটা ভঙ্গ করে তাহলে আদালতে বিষয়টি ফৌজদারি অপরাধে মামলা হলে আদালত যে সিদ্ধান্ত নেবে সেই মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে৷ যদি ভুক্তভোগীরা আমার দপ্তরে অভিযোগ জানিয়ে থাকে তাহলে সেটিও নিয়মানুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেবো। ভুক্তভোগীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট মানস দাশ জানিয়েছেন এখন পর্যন্ত দুই দফায় দুটি ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। ২০ আগস্ট দেয়াল নির্মানের ঘটনাটি আমরা পরবর্তী ধার্য্য তারিখে ১৪৫ ধারা ভঙ্গের বিষয়টি আদালতকে অবহিত করবো। এছাড়া বিগত কয়েকদিন যাবত আমার মক্কেলকে বিভিন্ন হুমকি ধমকির পাশাপাশি বড় অংকের চাঁদাদাবী করে আসছিল৷ এসবে কর্ণপাত না করায় ২৩ আগস্ট ভোরে আমার মক্কেল সৈয়দ নুরের জমির সীমানা দেয়াল ইউপি সদস্য জমির হোসেন ও তার দলবল ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়। আদালত অভিযোগটি তদন্ত করতে সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, এই জমির মেম্বারের বিরুদ্ধে ২০২১ সালের মার্চ মাসে মহিষ চুরির অভিযোগ উঠেছিল৷ সেই সময় গণমাধ্যমে বিষয়টি আলোচনায় এলে কিছুদিন গা ঢাকা দেয় জমির মেম্বার। পরে আবার ফিরে এসে এলাকায় জমি দখল থেকে শুরু করে নিয়মিত জুয়া ও মাদকের আসর বসায় বলে জানা গেছে। তবে থানা পুলিশকে ম্যানেজ করে সে নিয়মিত নানান অপকর্ম করে চলেছে।